বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনে ষড়াভিজ্ঞা জ্ঞান বা ষড়াভিজ্ঞা অরহৎ কেন বলা হয়?

কলমে- ধর্মদূত স্থবির এম. ধর্মবোধি ভিক্ষু
অধ্যক্ষ, গুমানমদ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
উদ্যোক্তা- শ্রদ্ধালংকার ইন্টারন্যাশনাল বুড্ডিস্ট মেডিটেশন সেন্টার, পরাতন চাদগাঁও থানা, চট্টগ্রাম।
(আশা করবো কেউ কপি করলে লিখকের নাম অবশ্যই প্রকাশ করবে)
বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনে ষড়াভিজ্ঞা জ্ঞান বা ষড়াভিজ্ঞা অরহৎ কেন বলা হয়? এই বিষয়ে প্রতিনিয়তো মানুষের মনে নানা প্রশ্ন আসে, বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও প্রচারপত্র বিলি করা হয় সেইখানে আমরা অরহৎলাভী, ষড়ভিজ্ঞা অরহৎ, ধুতাঙ্গ, মার্গলাভী ইত্যাদি ইত্যাদি রমরমা পদপদবী সম্ভাষন অবলোকন করি।
এই সমস্ত সম্ভাষণ দৃষ্টি নয়নে দেখলে মনোপৃষ্ঠে মানুষের নানা প্রশ্ন উৎপর্ত্তি হয় জানার আগ্রহ থেকে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই বিষয়ে নানা প্রশ্নের মুখামুখী হয়েছি। আজকেও এক ধার্মীক উপাসকের প্রশ্ন ছিলো ভান্তে মূলত ষড়াভিজ্ঞা জ্ঞান বা ষড়াভিজ্ঞা অরহৎ কেন বলে এবং কারাই বা ষড়াভিজ্ঞা অরহৎ?? উপাসক বাবুর প্রশ্নের উত্তরে আজকে এই লিখা।
আলোচ্য বিষয় ষড়াবিজ্ঞাঃ
বুদ্ধের জীবর্দশায় ও মহাপরিনির্বাণের পরে যে ভিক্ষু ছয় প্রকার উর্ধ ভাগীয় আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী তাকে ষড়াভিজ্ঞ বলা হয়।
ষড়াভিজ্ঞা এর অর্থ ছয়টি বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হন। এই ছয়টি জ্ঞাননবা মার্গ হলো ক) ঋদ্ধিবিদ্যা খ) দিব্যশ্রোত্র গ) দিব্যচক্ষু ঘ) পরচিত্তবিভাজন ও সত্ত্বদের চ্যুতি-উৎপত্তি জ্ঞান ঙ) পূর্বানিবাসানুস্মৃতি চ) আসবক্ষয় জ্ঞান।
আমি এখন ষড়াভিজ্ঞা জ্ঞানের সংক্ষিপ্ত সার সম্পর্কে যদি সরল ভাষায় আলোচনা করি তাহলে এখানে এই ছয়টি জ্ঞান বা ষড়াভিজ্ঞা অরহৎে লক্ষন বিষয় দাড়ায় এইরুপ-
১, ঋদ্ধিবিদ্যা, অনন্ত আকাশ, সাগর – মহাসাগর – মহাবিশ্ব – দশসহস্র চক্রবালের সকল সত্ত্বগনের রুপ ধারণ বা তৎ অনুরুপ সত্ত্বদের প্রজ্ঞা দ্বারা বশীকরণ করার নামই ঋদ্ধিবিদ্যা । বুদ্ধ প্রমুখ মহামোদ্গল্যায়ন ভান্তে সহ জীবর্দশায় অনেক মহাশ্রাবকের বাস্তব জীবনে এ মহাবিদ্যা তৎকালে বর্তমান ছিলেন।
২, দিব্যশ্রোত্র- সকল সত্ত্বার ভাষা বুঝা ও বলার সক্ষমতা অর্জন।
৩, দিব্যচক্ষু- অনন্ত লোকের অনন্ত সত্বগণের রুপ- আকার- প্রকার বুদ্ধাজ্ঞানে অনুদর্শন।
৪, পরচিত্তবিভাজন ও সত্ত্বদের চ্যুতি-উৎপত্তি জ্ঞান- দেখা- অদেখা সকল সত্ত্বগণের জন্ম- মরণ জনিত সুগতি- দুর্গতি ভূমিতে জন্ম পরিগ্রহ স্বীয় চিত্তে উৎপন্ন কুশলা- কুশল ধর্ম সমূহ সম্যক ভাবে অবলোকন।
৫, পূর্বানিবাসানুস্মৃতি- এক জন্ম- দ্বি- জন্ম – শত জন্ম- সহস্র জন্মের প্রতিসন্ধি- গ্রহনে স্থান – কাল- অবস্থান সম্যক ভাবে অবগত হওয়া বা তা বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষু সংঘকে প্রকাশ করা।
৬, আসবক্ষয় জ্ঞান – সর্বক্লেশ- সর্বদোষ- জাগতিক সকল লোকিয় কাম্য বস্তুর প্রতি লোভ-দ্বেষ- মোহকে সমূলে উৎপাঠন করার স্বভাব জাত অলোভ-অদ্বেষ- অমোহ অনুরুপ সকল জ্ঞানের উৎসই আসবক্ষয় বা অর্হৎ – এ উপনীত হওয়া ।
সুতরাং ষড়াভিজ্ঞা জ্ঞান বা অরহৎ সম্পর্কে আর কোন প্রশ্ন থাকে কিংবা আমার জ্ঞান অর্জিত লিখায় কোন ভূল থাকলে আপনারা কমেন্ট করে বা ফোন করে অবশ্যই আমাকে অবগত করবেন। আশা করি আমার এই সংক্ষিপ্ত লিখার মাধ্যমে পাঠক মহলে বুদ্ধজ্ঞান লাভ হবে এবং অরহৎ বীজ অংকুরিত হবে এবং মহা মঙ্গল সাধন হবে। দায়ক-দায়িকাগন ধর্মজ্ঞান লাভ করলে আমার লিখা সার্থক হবে। চক্রবাল বাসি সুখী হোক।
এখানে বলে রাখা ভালো, অর্হৎ বলতে কি বোঝায়-
আট পর্যায়ের সমাধি চর্চায় উত্তীর্ণ, দশ পর্যায়ের সমাধি চর্চায় উত্তীর্ণ, এগার পর্যায়ের সমাধি চর্চায় উত্তীর্ণ, বার পর্যায়ের সমাধি চর্চায় উত্তীর্ণ যারা হয়েছেন তাদের মূলত অরহৎ বলা হয়। এই বিষয়ে সময় সুযোগে কলম ধরবো বলে আশা রাখি।