সম্মান আয়নার মতো—আপনি যেমন দেবেন, তেমনই ফিরে পাবেন
কলমে: ধর্মদূত স্থবির এম. ধর্মবোধি ভান্তে
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ-
শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম
সম্মান হচ্ছে আয়নার মতো। আপনি যেমন আয়নার সামনে দাঁড়াবেন, আয়না ঠিক তেমনই আপনার প্রতিচ্ছবি ফিরিয়ে দেবে। তেমনি আপনি যদি মানুষকে সম্মান করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সম্মান একদিন আপনার কাছেই ফিরে আসে।”
বৌদ্ধ দর্শনের আলোকে মানুষের প্রতিটি চিন্তা, বাক্য ও কর্মের একটি অনিবার্য ফল রয়েছে। এই নীতিই কর্ম (কর্মফল)-এর চিরন্তন সত্য। তাই আমরা অন্যের প্রতি যে আচরণ করি, তা শুধু সামাজিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা আমাদের চরিত্র গঠন করে এবং ভবিষ্যতের সুখ-দুঃখেরও কারণ হয়ে ওঠে। সম্মানও তেমনই একটি মহৎ গুণ, যা অন্যকে প্রদান করলে তার সুফল একদিন কোনো না কোনোভাবে নিজের জীবনেই ফিরে আসে।
মানুষের জীবনে সম্মান এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা অর্থ, ক্ষমতা কিংবা পদমর্যাদা দিয়ে কেনা যায় না। এটি অর্জিত হয় শীল, সদাচার, সত্যবাদিতা, বিনয়, ধৈর্য, মৈত্রী ও করুণার মাধ্যমে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ সম্মান প্রত্যাশা করে, কিন্তু অনেকেই ভুলে যায়—সম্মান পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো অন্যকে সম্মান করা।
যেমন একটি নির্মল আয়না কখনো মিথ্যা প্রতিচ্ছবি দেখায় না, তেমনি মানুষের আচরণও একদিন তার নিজের জীবনেই প্রতিফলিত হয়। আপনি যদি কাউকে অপমান করেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন, অহংকারে আঘাত করেন কিংবা অবজ্ঞা করেন, তবে সেই কর্মের অকল্যাণকর ফল একদিন আপনাকেও স্পর্শ করবে। আবার আপনি যদি বিনয়, সৌজন্য, আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মানুষের সঙ্গে আচরণ করেন, তবে মানুষের হৃদয়ে আপনার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জন্ম নেবে। এটিই কর্মফলের স্বাভাবিক নিয়ম।
বুদ্ধের দেশনায় অহংকার মানুষের অন্যতম বড় শত্রু এবং বিনয় মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলংকার। যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞান, সম্পদ, বংশ বা ক্ষমতার অহংকারে অন্যকে তুচ্ছ করে, সে নিজের মনকেই কলুষিত করে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি সকল মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করে, বয়োজ্যেষ্ঠদের শ্রদ্ধা করে, শিক্ষককে সম্মান করে, সৎজনের গুণের প্রশংসা করে এবং সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করে, সে নিজের মধ্যেই আর্যগুণের বিকাশ ঘটায়।
বৌদ্ধধর্মে মেত্তা (মৈত্রী), করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা—এই চার ব্রহ্মবিহার চর্চার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি মৈত্রীর মন নিয়ে সকলের সঙ্গে আচরণ করে, সে কাউকে অপমান করতে পারে না। যার অন্তরে করুণা আছে, সে অন্যের মর্যাদা নষ্ট করে না। যার মনে মুদিতা আছে, সে অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত না হয়ে আনন্দিত হয়। আর যার মধ্যে উপেক্ষার গুণ রয়েছে, সে অপমানের প্রতিশোধ না নিয়ে প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ফলে তার জীবন সম্মান ও শান্তিতে পরিপূর্ণ হয়।
বুদ্ধ বলেছেন:
“ন হি বেরেণ বেরাণি সম্মন্তীধ কুদাচনং; অবেরেণ চ সম্মন্তি, এস ধম্মো সনন্তনো।”
অর্থাৎ—”বিদ্বেষ দ্বারা কখনো বিদ্বেষের অবসান হয় না; অবিদ্বেষ তথা মৈত্রীর দ্বারাই বিদ্বেষের অবসান ঘটে। এটাই চিরন্তন সত্য।”
এই চিরন্তন সত্য আমাদের শেখায়, অসম্মানের জবাবে অসম্মান নয়; বরং ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সদাচরণই একজন সত্যিকারের জ্ঞানীর পরিচয়।
তবে এটিও সত্য যে, পৃথিবীর সব মানুষ আপনার সম্মানের প্রতিদান সম্মান দিয়ে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কেউ কৃতজ্ঞ হবে, কেউ উদাসীন থাকবে, আবার কেউ আপনার নম্রতাকে দুর্বলতা মনে করবে। কিন্তু একজন বৌদ্ধ অনুসারীর কর্তব্য অন্যের আচরণ দেখে নিজের চরিত্র পরিবর্তন করা নয়। কারণ আমাদের কর্ম আমাদেরই; অন্যের কর্ম তার নিজের। তাই অন্যায়ের প্রতিক্রিয়ায় অন্যায় নয়, বরং শীল, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে নিজের মনকে কলুষমুক্ত রাখাই শ্রেয়।
সম্মান চাওয়ার আগে সম্মান দিতে শিখতে হবে। পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা ধর্মীয় জীবনে—আপনি যেভাবে অন্যের সঙ্গে আচরণ করবেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেই শিক্ষাই গ্রহণ করবে। তাই সম্মানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুরু করতে হবে নিজের মন থেকে। নিজের বাক্যকে সত্য, আচরণকে নম্র এবং হৃদয়কে মৈত্রীর আলোয় আলোকিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়—সম্মান সত্যিই একটি আয়নার মতো। আপনি মানুষের প্রতি যে সম্মান, ভালোবাসা, সৌজন্য ও মর্যাদা প্রদর্শন করবেন, কর্মফলের নিয়মে তার শুভ প্রতিফল একদিন আপনার জীবনেও ফিরে আসবে। কারণ বুদ্ধের দেশনায় মানুষ তার কর্মেরই উত্তরাধিকারী। তাই আসুন, অহংকার নয়—বিনয়কে, ঘৃণা নয়—মৈত্রীকে, অবজ্ঞা নয়—সম্মানকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। তবেই ব্যক্তি, সমাজ ও মানবসভ্যতা সত্যিকার অর্থে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবে।
সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু।
সকল প্রাণী সুখী হোক, নিরাপদে থাকুক এবং কল্যাণ লাভ করুক।