ভারতে বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থানে হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিক্ষোভ, পুলিশের হস্তক্ষেপ
এবার ভারতের বিহার রাজ্যের মহাবোধি মন্দিরে হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এই বিক্ষোভে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অংশ নিচ্ছেন। মন্দিরের সন্ন্যাসীদের পুলিশের জোরপূর্বক সযরিয়ে দেওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। খবরটি জানিয়েছে আল-জাজিরা।
বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী, মহাবোধি মন্দির হলো সেই স্থান যেখানে গৌতম বুদ্ধ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। আল-জাজিরাকে অভিষেক বুদ্ধ নামে একজন বলেন, ১৫ বছর ধরে তিনি বিহারের এই শহরে আছেন, এমন পরিস্থিতি কখনও দেখেননি। বর্তমানে সারাদেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেখানে জড়ো হচ্ছেন ও মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হাতে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছেন।
ভারতের বিভিন্ন বৌদ্ধ সংগঠনগুলো সমাবেশে অংশগ্রহণ করছে, যার মধ্যে লাদাখ, মুম্বাই এবং মহীশুরের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। বর্তমানে, আরও অনেক মানুষ বুদ্ধ গয়ার প্রধান প্রতিবাদে যোগ দিতে আসছেন, এমনটি জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া বৌদ্ধ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আকাশ লামা। ২০১১ সালের গণনা অনুযায়ী, ভারতে মোট বৌদ্ধ নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি।
বিহারের বুদ্ধ গয়া মন্দির ১৯৪৯ সালের একটি রাজ্য আইনের অধীনে গত ৭৬ বছর ধরে একটি ৮ সদস্যের কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কমিটিতে ৪ জন হিন্দু ও ৪ জন বৌদ্ধ সদস্য রয়েছেন।
সন্ন্যাসীরা একটি ব্যানার হাতে নিয়ে এই আইন বাতিলের ও মন্দিরটি সম্পূর্ণভাবে বৌদ্ধদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে ও তারা এমন কিছু ধর্মীয় আচরণ ও অনুষ্ঠান করছে যা বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বিক্ষোভকারীরা জানান, বুদ্ধ বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ছিলেন। ভারতের ছত্তিশগড় থেকে বুদ্ধ গয়া আসা এক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বলেন, ভারতের সকল ধর্ম নিজ নিজ ধর্মীয় স্থানগুলোর দেখাশোনা ও পরিচালনা করে, তাহলে হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজন কেন একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থানের কমিটিতে যুক্ত হচ্ছেন? তার অভিযোগ, বৌদ্ধরা এখনও সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, যদি তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ না করেন, তবে তারা কি করবেন?
গুজরাট থেকে আসা এক বিক্ষোভকারী বলেন, শুরু থেকে তারা যখন সেখানে আসতেন, তখন থেকেই হিন্দু ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান দেখে তারা হতাশ হতেন কারণ বুদ্ধ এসব আচার-অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করেছিলেন।
২০১২ সালে, ১৯৪৯ সালের আইনটি বাতিল করতে দুই জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দায়ের করেছিলেন। তবে, সেই মামলাটি ১৩ বছর পরও শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়নি। এরই মধ্যে, সন্ন্যাসীরা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে স্মারকলিপি দিয়েছেন ও রাস্তায় মিছিলও করেছেন। পরিস্থিতি গত মাসে আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ১৪ দিন ধরে অনশনে থাকাকালীন, রাতের অন্ধকারে রাজ্য পুলিশ তাদের মন্দির চত্বর থেকে সরিয়ে দেয়। ভারতীয় বৌদ্ধ কনফেডারেশনের সম্পাদক প্রজ্ঞা মিত্র প্রশ্ন করেন, তারা কি সন্ত্রাসী? কেন তারা নিজেদের মন্দির চত্বরে প্রতিবাদ করতে পারবেন না?
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২৬০ খ্রিষ্টপূর্বে সম্রাট অশোক বুদ্ধ গয়া সফরের পর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, যা বুদ্ধের আত্মপ্রকাশের প্রায় ২০০ বছর পর। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, এটি বহু বছর ধরে বৌদ্ধদের ব্যবস্থাপনায় ছিল, তবে ১৩শ শতাব্দীতে অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এর অবস্থা পাল্টাতে শুরু করে। ইউনেস্কোর মতে, ১৩শ থেকে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত মন্দিরটি অনেকটা পরিত্যক্ত ছিল। পরে, ব্রিটিশরা মন্দির সংস্কারের কাজ শুরু করে। তবে, মন্দিরের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৫৯০ সালে এক হিন্দু সাধু মন্দিরে এসে বসবাস করতে শুরু করেন, যেখানে তিনি পূজা-অর্চনা করতেন। পরবর্তীতে সেখানে বুদ্ধ গয়া মন্দির নামে একটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকে মন্দিরটি তাদের উত্তরাধিকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
বুদ্ধ গয়া মন্দিরের তত্ত্বাবধানে থাকা স্বামী বিবেকানন্দ গিরি নামে এক হিন্দু পুরোহিত এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আকাশ লামা মন্তব্য করেছেন, প্রতিবাদকারীদের জন্য খুব কমই আশা রয়েছে যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার তাদের দাবিগুলোকে শোনার চেষ্টা করবে।