রবিন বড়ুয়া (এম. এ.) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ভূমিকা
ত্রিপিটক শাস্ত্রের দ্বিতীয় বিভাগ সূত্রপিটক। সূত্রপিটকেরই দ্বিতীয় অর্থাৎ মধ্যম নিকায়ের ৫৫ নং সূত্রটি হল ‘জীবক সূত্র’। ” মাংস ভক্ষণের কারণে জীবহত্যার মত নিমিত্তকর্মের ভাগী হতে হয় কি না?” – জীবকের এমন প্রশ্নে ভগবান বুদ্ধের সুনিপুণ যুক্তির ভিত্তিতেই মূলত জীবক সূত্রের আলোচনা ; যা বৌদ্ধধর্মে মাংস ভক্ষণের পক্ষে বিপক্ষের বিতর্ক নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
*জীবক সূত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
জীবক ছিলেন বুদ্ধযুগের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক।জন্মের পর তিনি পরিত্যাক্ত হন, তবে বিম্বিসারের এক পুত্র অভয়কুমার তাকে কুড়িয়ে পান ও লালন পালন করেন, যার দরুণ তিনি কুমারের পালিত বৎস বা কুমারবচ্চ নামেও পরিচিত।মগধরাজ বিম্বিসারের রাজবৈদ্য ছিলেন তিনি, তবে৷ স্বয়ং বুদ্ধের চিকিৎসক হিসেবেই তিনি ইতিহাসে সমাদৃত। তথ্যসূত্র: (Ñāṇamoli & Bodhi, 1995)।
তথাগত বুদ্ধ একসময় জীবকের আম্রকাননে অবস্হান করছিলেন। সেসময় জীবক বুদ্ধকে বন্দনান্তে একপাশে উপবেশন করেন, কুশলাদি শেষে বুদ্ধকে প্রশ্ন করেন – “ভগবান, অনেকে বলে শ্রমণ গৌতমের উদ্দেশ্যে প্রাণীহত্যা করা হয় এবং গৌতমও সজ্ঞানে সে প্রাণীর পক্ক মাংস ভোজন করে নিমিত্তকর্মের ভাগী হন। এসব কি সত্য বলে মনে করতে পারি?”
বুদ্ধ উত্তরে বললেন- যারা এরূপ বলে তারা অসত্য বলে, অকারণে তথাগতকে অপবাদ দেয়। তথাগত তিন প্রকার মাংস গ্রহণযোগ্য নয় বলে পরিত্যাগ করেন। যথা: দৃষ্ট, শ্রুত, ও পরিশঙ্কিত। শুধুমাত্র অদৃষ্ট, অশ্রুত ও অপরিশঙ্কিত মাংসই ভোজনযোগ্য। বুদ্ধের শ্রাবক সঙ্ঘও এই নীতি মেনে চলেন।”
তথ্যসূত্র:( Majjhima Nikāya 55: Jīvaka Sutta)
*মাংস অপরিভোগের ৩টি কারণের ব্যাখা:
১. “দৃষ্ট”(দেখা) বলতে বুদ্ধ বুঝিয়েছেন, যদি কোনো ব্যাক্তি চাক্ষুষ অর্থ্যাৎ চোখের সামনে কোনো প্রাণীকে হত্যা করতে দেখেন, তবে তিনি সে মাংস খেতে পারবেন না।
২. শ্রুত(শোনা) বলতে বুদ্ধ বুঝিয়েছেন – যদি কারো উদ্দেশ্যে প্রাণীহত্যা করা হয় এবং তা ঐ ব্যাক্তির কর্ণগোচর হয়,তবে তিনি সে মাংস খেতে পারবেন না।
৩. “পরিশংকিত”(সন্দেহযুক্ত) বলতে বুদ্ধ বুঝিয়েছেন – যদি রান্না করা কোনো মাংস ব্যাক্তির নিজের জন্য হত্যা করে তৈরী করা হয়েছে- খাবার গ্রহনের সময় এরূপ সন্দেহের সৃষ্টি হয়,তবে ব্যাক্তি সে মাংস খেতে পারবেন না।
এই তিনটি নীতির মাধ্যমে বুদ্ধ মাংস ভক্ষণকে নৈতিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ করেছেন।ভগবানের সুন্দর, সুচারূ ও সাবলীল এই ৩ উত্তর উপস্হাপন জীবককে প্রীত ও সন্তুষ্ট করে।
*ভিক্ষু-সংঘের মাংস ভোজনের যৌক্তিকতা:
উপরোক্ত ৩ নিয়ম ভিক্ষুসংঘের জন্যও বর্তায়। অর্থ্যাৎ, কোনো প্রাণী হত্যার সময়ে দৃষ্ট,
ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে কোনো প্রাণী বধ করা হয়েছে এরূপ শ্রুত এবং উভয় প্রকারে কিংবা উভয় মুক্তভাবে পরিশঙ্কিত মাংস ভোজন করলে ভিক্ষুদের আপত্তি (দোষ) হয়।
তদ্বিপরীতে, যদি গৃহীরা বলেন যে, ভিক্ষুদের উদ্দেশ্য নয়; অন্য কারণে সজ্জিত কিংবা কপ্পিয় মাংস পাওয়ায় তা ভিক্ষুদের জন্য সম্পাদিত হয়েছে তবে ভিক্ষুরা সে মাংস নির্দ্বিধায় ভোজন করতে পারবেন।
কোনো দায়ক একজন ভিক্ষুকে তার গৃহে আহারের নিমন্ত্রণ(ফাং) করলে, ভিক্ষু সেই নিমন্ত্রন গ্রহণ করেন। দায়ক ভিক্ষুকে উত্তম আহার প্রদান করলে ভিক্ষু সেই উত্তম আহার গ্রহণ করে দায়ককে ধন্যবাদ জানান ও আশীর্বাদ করেন বটে; তবে এরূপ উত্তম খাদ্য দায়ক তাকে প্রদান করুক – এই ভাবনা একজন ভিক্ষুর মনে কখনো উদয় হয় না। কারণ ভিক্ষুসংঘ সর্বদা অনাসক্ত হয়েই ভিক্ষান্ন গ্রহণ করেন। যেহেতু উন্নত মাংস ভোজনের মোহ বা আসক্তি ভিক্ষুর চিত্তে উৎপন্নই হয় না অতএব, ভোজনে মাংস গ্রহনের দরুণ তারা প্রাণীহিংসা/প্রাণীহত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত হন না।তাদের জীবনদর্শন সর্বদা সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী, করুণা ও বৈরহীনতার উপর প্রতিষ্ঠিত।
* মাংস দানে গৃহীর নৈতিক দায়:
যে গৃহী ভিক্ষু-সংঘ বা বুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রাণী হত্যা করে, সে পাঁচটি পর্যায়ে অপুণ্যের অংশীদার হয়। এই পর্যায়গুলো হলো—
১. হত্যার নির্দেশ প্রদান: গৃহী যখন কোনো প্রাণীকে বধ করার নির্দেশ দেন, তখনই প্রথম অপুণ্যের সূত্রপাত ঘটে।
২. প্রাণীর কষ্টের কারণ হওয়া: যখন প্রাণীকে রশি বেঁধে বা টেনে আনা হয়, তখন তার দুঃখ-সন্তাপের কারণে গৃহী অপুণ্যের ভাগী হন।
৩. হত্যার প্রত্যক্ষ আদেশ: রান্না বা ভোজনের উদ্দেশ্যে প্রাণী হত্যার নির্দেশ প্রদান গুরুতর নৈতিক দায় সৃষ্টি করে।
৪. হত্যাকালীন যন্ত্রণার সহায়ক হওয়া: হত্যার সময় প্রাণী যে অপরিসীম কষ্ট ভোগ করে, তার জন্য গৃহী অপুণ্যের অংশীদার হন।
৫. অকপ্পিয় মাংস দ্বারা আপ্যায়ন: এইভাবে প্রস্তুত মাংস দ্বারা ভিক্ষুকে আপ্যায়ন করা চূড়ান্তভাবে অপুণ্যের কারণ হয়।
সুতরাং, ভিক্ষুসংঘে ভোজনদান অসীম পূণ্যের কর্ম হলেও, জেনেশুনে প্রাণী হত্যা করে সে মাংস দ্বারা ভিক্ষুসংঘকে ভোজনদান নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং অপুণ্যের কারণ।
*শেষকথা:
বর্তমান বৌদ্ধসমাজে মাংস ভক্ষণ এবং ভিক্ষুসংঘকে ভোজনে মাংস দানেনিয়ে নানা মতভেদ ও সংশয় বিদ্যমান। জীবক সূত্র এই সংশয় নিরসনে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক কাঠামো প্রদান করে।
এই সূত্রের আলোচনার ভিত্তিতে বলাই যায়—ভগবান বুদ্ধ মাংস ভক্ষণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেননি; বরং তিনি দৃষ্ট, শ্রুত ও পরিশঙ্কিত শুধুমাত্র এই তিন প্রকার মাংস ভক্ষণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
এভাবে তিনি ভোজনকে সম্পূর্ণভাবে নৈতিক বিবেচনার অধীনস্থ করে এক মধ্যপন্থার নির্দেশ দিয়েছেন।
তথ্যসূত্র:
১.Bodhi, Bhikkhu (Trans.). (1995). The Middle Length Discourses of the Buddha: A Translation of the Majjhima Nikāya. Boston: Wisdom Publications.
২.Majjhima Nikāya. (n.d.). Jīvaka Sutta (MN 55).
৩.Harvey, P. (2013). An Introduction to Buddhist Ethics: Foundations, Values and Issues. Cambridge: Cambridge University Press.