বৌদ্ধ দর্শনে ষড়ভিজ্ঞ অরহৎ সম্পর্কে জানুন
(একটি প্রবন্ধধর্মী গ্রন্থশৈলীর নিবন্ধ)
কলমে- ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে–
অধ্যক্ষ, গুমানমদ্দন শান্তি বিহার,
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, পুরাতন চান্দগাঁও
ভূমিকা
মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বৌদ্ধ দর্শন আমাদের নিয়ে যায় দুঃখ, তার কারণ, এবং দুঃখ নিরোধের পথে। এই পথের সর্বোচ্চ অর্জন হলো অরহৎত্ব, যেখানে ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে ক্লেশমুক্ত হয়ে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন।
অরহৎদের মধ্যেই এক বিশেষ শ্রেণির সাধক আছেন, যাঁরা গভীর ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে ছয় প্রকার অতীন্দ্রিয় জ্ঞান অর্জন করেন। এদের বলা হয় ষড়ভিজ্ঞ অরহৎ। এই “ষড়ভিজ্ঞা” কেবল অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ নয়, বরং চিত্তের পূর্ণ বিকাশ ও প্রজ্ঞার পরিপূর্ণতার প্রতিফলন।
ষড়ভিজ্ঞা : ধারণা ও প্রকৃতি
“অভিজ্ঞা” শব্দের অর্থ উচ্চতর জ্ঞান বা বিশেষ উপলব্ধি। বৌদ্ধ সাধনায় ছয়টি বিশেষ জ্ঞানকে সম্মিলিতভাবে বলা হয় “ষড়ভিজ্ঞা”। এই জ্ঞানসমূহ সাধকের ধ্যানশক্তির গভীরতা এবং মানসিক পরিশুদ্ধতার ফল।
এগুলো অর্জন করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়; বরং দীর্ঘ সাধনা, শীল পালন, এবং একাগ্র চিত্তের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে এই অবস্থায় পৌঁছাতে হয়।
ষড়ভিজ্ঞার প্রকারভেদ
১. ইদ্ধিবিধ অভিজ্ঞা
এটি অলৌকিক শক্তির প্রকাশ। সাধক এই জ্ঞানের মাধ্যমে প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করতে পারেন। যেমন—আকাশে উড্ডয়ন, পানির উপর দিয়ে চলা, দূরবর্তী স্থানে মুহূর্তে গমন ইত্যাদি।
২. দিব্যশ্রোত্র
এই জ্ঞান অর্জনের ফলে সাধক সূক্ষ্ম ও দূরবর্তী শব্দ শুনতে পারেন। সাধারণ মানুষের শ্রবণক্ষমতার বাইরে থাকা শব্দও তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩. পরচিত্তবিজ্ঞান
এই অভিজ্ঞা অন্যের মন বোঝার ক্ষমতা প্রদান করে। সাধক অন্যের চিন্তা, অনুভূতি ও মানসিক অবস্থা অনুধাবন করতে সক্ষম হন।
৪. পূর্বনিবাসানুস্মৃতি জ্ঞান
এই জ্ঞানের মাধ্যমে সাধক নিজের পূর্বজন্মের স্মৃতি প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেন। জন্ম-মৃত্যুর ধারাবাহিকতা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সংসারের প্রকৃতি উপলব্ধিতে সহায়ক।
৫. দিব্যচক্ষু
এই জ্ঞান দ্বারা জীবের জন্ম-মৃত্যু এবং কর্মফলের গতিবিধি দেখা যায়। কে কী কর্মফলের কারণে কোথায় জন্ম নিচ্ছে, তা সাধকের কাছে স্পষ্ট হয়।
৬. আসবক্ষয় জ্ঞান
এটি ষড়ভিজ্ঞার মধ্যে সর্বোচ্চ। এই জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সমস্ত ক্লেশ ও আসব সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয় এবং সাধক নির্বাণ লাভ করেন। এই জ্ঞানই অরহৎত্বের প্রকৃত চিহ্ন।
লোকীয় ও লোকোত্তর দৃষ্টিকোণ-
ষড়ভিজ্ঞার মধ্যে প্রথম পাঁচটি জ্ঞানকে “লোকীয়” বলা হয়, কারণ এগুলো জাগতিক ক্ষমতার অন্তর্গত। এগুলো চিত্তের শক্তির বিকাশ ঘটায়, কিন্তু মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না।
অপরদিকে, আসবক্ষয় জ্ঞান “লোকোত্তর”—এটি চূড়ান্ত মুক্তির পথ নির্দেশ করে।
অতএব, প্রথম পাঁচটি অভিজ্ঞা যেখানে ক্ষমতার প্রতীক, সেখানে ষষ্ঠটি মুক্তির প্রতীক।
অরহৎ ও ষড়ভিজ্ঞা
সব অরহৎই আসবক্ষয় জ্ঞান অর্জন করেন, কিন্তু সবাই অন্যান্য পাঁচটি অভিজ্ঞা অর্জন করেন না।
কিছু অরহৎ শুধুমাত্র প্রজ্ঞার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করেন, আবার কেউ কেউ গভীর ধ্যানের মাধ্যমে সব ছয়টি অভিজ্ঞাই অর্জন করেন।
এই দ্বিতীয় শ্রেণির অরহৎদেরই বলা হয় “ষড়ভিজ্ঞ অরহৎ”।
সাধনার পথ—
ষড়ভিজ্ঞা অর্জনের জন্য বৌদ্ধ সাধনায় তিনটি মূল ভিত্তি অপরিহার্য—
শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা।
শীল চিত্তকে পবিত্র করে, সমাধি একাগ্রতা বৃদ্ধি করে, এবং প্রজ্ঞা সত্য উপলব্ধি করায়। এই তিনের সমন্বয়েই চিত্ত ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ হয়ে উচ্চতর জ্ঞানের উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
দার্শনিক তাৎপর্য
ষড়ভিজ্ঞা বৌদ্ধ দর্শনের গভীর দিককে উন্মোচিত করে। এটি দেখায় যে—
মানবচিত্তের সম্ভাবনা সীমাহীন, এবং যথাযথ সাধনার মাধ্যমে তা অসাধারণ স্তরে উন্নীত হতে পারে।
তবে বৌদ্ধ শিক্ষা এই বিষয়েও সতর্ক করে যে, এসব ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও দুঃখ নিরোধের জন্য।
উপসংহার
ষড়ভিজ্ঞ অরহৎ বৌদ্ধ সাধনার এক উচ্চতম শিখর। এটি কেবল অলৌকিক শক্তির অর্জন নয়, বরং চূড়ান্ত মুক্তি ও শান্তির উপলব্ধি।
মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে এই মুক্তির পথেই—যেখানে ক্লেশ নেই, দুঃখ নেই, আছে শুধু প্রশান্তি ও নির্বাণ।
সমাপনী প্রার্থনা
সকল প্রাণী সুখী হোক।
সকল প্রাণী দুঃখমুক্ত হোক।
সকলেই নির্বাণের পথে অগ্রসর হোক।