বৌদ্ধ দর্শনে অরহৎ চিনার উপায়!
(ত্রিপিটকের আলোকে যুক্তি, উপমা ও বিশ্লেষণসমৃদ্ধ প্রবন্ধধর্মী অধ্যায়)
অধ্যক্ষ, গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারী,
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ-
শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির,
পুরাতন চান্দগাঁও।
ভূমিকা–
মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী—এই প্রশ্ন মানবচিন্তার ইতিহাসে চিরন্তন। কেউ সুখকে লক্ষ্য বলে, কেউ সাফল্যকে, আবার কেউ মুক্তিকে। কিন্তু বৌদ্ধ দর্শন এক অনন্য ও গভীর উত্তর প্রদান করে—মানবজীবনের প্রকৃত লক্ষ্য হলো দুঃখ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি, যা নির্বাণ নামে পরিচিত। এই নির্বাণলাভের জীবন্ত প্রতিমূর্তি হলেন অরহৎ—যিনি সমস্ত ক্লেশকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে জন্ম-মৃত্যুর অনন্ত চক্র থেকে মুক্তি লাভ করেছেন।
কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম ও জটিল প্রশ্ন উদ্ভব হয়—কিভাবে একজন অরহৎকে চিনা যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর বাহ্যিক দৃষ্টিতে পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ অরহৎ কোনো বাহ্যিক পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি একান্তই অন্তর্দৃষ্টির, প্রজ্ঞার এবং চিত্তশুদ্ধির বিষয়। তাই এই অধ্যায়ে আমরা ত্রিপিটকের আলোকে, যুক্তি ও উপমার সাহায্যে অরহৎ চিনার প্রকৃত পদ্ধতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবো।
অরহৎ: সংজ্ঞা ও দার্শনিক ভিত্তি-
“অরহৎ” (Arahant) শব্দটি পালি ভাষা থেকে আগত, যার অর্থ—“যিনি পূজনীয়”, “যিনি যোগ্য”, অথবা “যিনি সমস্ত আসবক্ষয় সম্পন্ন করেছেন”। বৌদ্ধ শাস্ত্র অনুযায়ী, অরহৎ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি লোভ, দ্বেষ এবং মোহ—এই তিনটি মূল ক্লেশকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করেছেন এবং চার আর্যসত্যকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছেন।
সংযুক্ত নিকায়ের অনাত্তলক্ষণ সূত্রে (SN 22.59) বর্ণিত হয়েছে যে, যিনি রূপ, বেদনা, সঞ্জ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান—এই পাঁচ স্কন্ধকে অনাত্ম হিসেবে উপলব্ধি করেন এবং বুঝতে পারেন “এটা আমার নয়, আমি নই, এটা আমার আত্মা নয়”—তিনিই প্রকৃত মুক্তির পথে প্রতিষ্ঠিত। আবার ধম্মপদের ৯০ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, “যার পথের কোনো চিহ্ন নেই, যিনি ক্লেশমুক্ত, তিনিই প্রকৃত শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত।”
এখানে যুক্তিগতভাবে বিষয়টি পরিষ্কার হয়—যেখানে ক্লেশ আছে, সেখানে আসক্তি আছে; যেখানে আসক্তি আছে, সেখানে পুনর্জন্ম আছে। অতএব, যেখানে ক্লেশ নেই, সেখানে পুনর্জন্মের কোনো কারণই অবশিষ্ট থাকে না। এই অবস্থাই অরহতের প্রকৃত পরিচয়।
যেমন একটি বীজ থাকলে গাছ জন্মায়, আর বীজ না থাকলে গাছ জন্মায় না—তেমনি ক্লেশই হলো পুনর্জন্মের বীজ। অরহৎ সেই ব্যক্তি, যিনি এই বীজকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছেন।
অরহতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য
অরহতের চিত্ত ও আচরণে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়, যা ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
প্রথমত, ক্লেশক্ষয় বা অন্তরের সম্পূর্ণ নির্মলতা। মজ্ঝিম নিকায়ের বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে যে, আসবক্ষয় জ্ঞানই মুক্তির চূড়ান্ত স্তর। অরহতের চিত্তে লোভ, ক্রোধ বা মোহের কোনো অবশিষ্ট থাকে না। যুক্তিগতভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়—লোভ থাকলে আসক্তি থাকবে, আসক্তি থাকলে দুঃখ থাকবে। অতএব, লোভহীনতা মানেই দুঃখহীনতা।
এই অবস্থাকে একটি উপমার মাধ্যমে সহজে বোঝানো যায়। যেমন আগুন জ্বলে জ্বালানির উপর নির্ভর করে; জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে আগুন নিজে থেকেই নিভে যায়। তেমনি ক্লেশ নামক জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে দুঃখ নামক আগুনও নিভে যায়।
দ্বিতীয়ত, সমতা বা উপেক্ষা। অঙ্গুত্তর নিকায়ে সমত্বকে একটি মহৎ গুণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অরহৎ সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, নিন্দা-প্রশংসা—সবকিছুর মধ্যে সমান থাকেন। কারণ তার মধ্যে “আমি” বা “আমার” ধারণা আর অবশিষ্ট নেই। যেখানে “আমি” নেই, সেখানে “আমার লাভ” বা “আমার ক্ষতি”ও নেই। ফলে তার চিত্ত সর্বদা অচঞ্চল থাকে।
এক্ষেত্রে পাহাড়ের উপমা প্রযোজ্য। যেমন পাহাড় ঝড়, বৃষ্টি বা বজ্রপাতেও অচঞ্চল থাকে, তেমনি অরহতের মনও কোনো পরিস্থিতিতে বিচলিত হয় না।
তৃতীয়ত, অনাত্মবোধ। অরহৎ সম্পূর্ণরূপে “আমি” ধারণা থেকে মুক্ত। সংযুক্ত নিকায়ের অনাত্তলক্ষণ সূত্রে বলা হয়েছে—“এটা আমার নয়, আমি নই, এটা আমার আত্মা নয়।” এই উপলব্ধি কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
যেমন আকাশে মেঘ আসে ও যায়, কিন্তু আকাশ কখনো মেঘকে নিজের বলে ধারণ করে না—তেমনি অরহৎও কোনো কিছুতে আসক্ত হন না।
চতুর্থত, তৃষ্ণাক্ষয়। ধম্মপদে বলা হয়েছে—ভোগের দ্বারা কখনো তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় না। অরহৎ এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করে সমস্ত কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত হয়েছেন। তৃষ্ণাই দুঃখের মূল, তাই তৃষ্ণার অবসান মানেই দুঃখের অবসান।
এই অবস্থাকে বোঝাতে লবণাক্ত পানির উপমা দেওয়া যায়। যতই লবণ পানি পান করা হোক, তৃষ্ণা ততই বাড়ে। অরহৎ এই অন্তহীন চক্র থেকে নিজেকে মুক্ত করেছেন।
পঞ্চমত, প্রজ্ঞা। অরহৎ চার আর্যসত্যকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছেন। মজ্ঝিম নিকায়ে এই প্রজ্ঞাকে মুক্তির মূল চাবিকাঠি বলা হয়েছে। অজ্ঞতা থেকে তৃষ্ণা জন্মায়, তৃষ্ণা থেকে দুঃখ; আর প্রজ্ঞা এই চক্রকে ভেঙে দেয়।
যেমন অন্ধকার ঘরে একটি প্রদীপ জ্বালালে মুহূর্তেই সব স্পষ্ট হয়ে যায়—তেমনি প্রজ্ঞা সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করে দেয়।
অরহৎকে চিনা কেন কঠিন—এই প্রশ্নের উত্তরও ত্রিপিটকে পাওয়া যায়।
প্রথমত, মানুষের চিত্ত বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান নয়। অঙ্গুত্তর নিকায়ে বলা হয়েছে—অন্যের মন জানা অত্যন্ত কঠিন। বাহ্যিক আচরণ দেখে অভ্যন্তরীণ সত্য নির্ণয় করা সবসময় সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃত অরহৎ নিজেকে কখনো প্রচার করেন না। তার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্রও থাকে না। ফলে তিনি নিজের মহত্ত্ব প্রকাশ করার কোনো প্রয়াস গ্রহণ করেন না।
এক্ষেত্রে নদীর উপমা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গভীর নদী সাধারণত শান্ত থাকে, আর অগভীর নদীই বেশি শব্দ করে। তেমনি প্রকৃত মহাপুরুষরা সাধারণত নীরব ও সংযত হন।
তৃতীয়ত, প্রতারণার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনয় পিটকে বলা হয়েছে, মিথ্যা অরহৎ দাবি করা গুরুতর অপরাধ। তাই কেবল কথার উপর ভিত্তি করে কাউকে অরহৎ বলে গ্রহণ করা বিপজ্জনক।
যাচাইয়ের নীতি: কালাম সূত্রের আলোকে-
অঙ্গুত্তর নিকায়ের কালাম সূত্রে বুদ্ধ এক অসাধারণ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন—গুজব, প্রচলিত বিশ্বাস বা অন্ধ অনুসরণে বিশ্বাস করো না; এমনকি কেবল যুক্তির উপরও নির্ভর করো না। বরং যা কল্যাণকর, যা নিজে ও অন্যের জন্য মঙ্গলজনক, তা নিজে যাচাই করে গ্রহণ করো।
এই নীতির আলোকে অরহৎ চিনার জন্য প্রয়োজন—দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ, তার আচরণে কল্যাণ ও শান্তির উপস্থিতি যাচাই করা, এবং তার দ্বারা নিজের ও অন্যের উপকার হচ্ছে কি না তা বিচার করা।
এটি সোনা যাচাই করার মতো। সোনাকে যেমন ঘষে, কেটে এবং আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়, তেমনি একজন ব্যক্তির প্রকৃত গুণাবলীও সময়ের পরীক্ষায় যাচাই করতে হয়।
বাস্তবিক লক্ষণ ও আপেক্ষিক পরিচয়
যদিও নিশ্চিতভাবে কাউকে অরহৎ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন, তবুও কিছু আপেক্ষিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে। তিনি সাধারণত অহংকারহীন, বিনয়ী এবং শান্ত স্বভাবের হন। তার মধ্যে লোভ, হিংসা বা ক্রোধের প্রকাশ থাকে না। তিনি সকল পরিস্থিতিতে সমান থাকেন এবং তার উপস্থিতিতে অন্যরা মানসিক শান্তি অনুভব করে।
এই বিষয়টি একটি সুন্দর উপমার মাধ্যমে বোঝানো যায়। একটি সুগন্ধি ফুল কখনো নিজেকে পরিচয় করায় না; তার সুবাসই তার পরিচয় বহন করে। তেমনি অরহতের জীবনই তার পরিচয়।
সতর্কতা: মধ্যপন্থার প্রয়োজনীয়তা
বৌদ্ধ দর্শনে চরমপন্থা পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্ধভাবে কাউকে অরহৎ মনে করা যেমন ভুল, তেমনি অযথা সন্দেহ করাও ঠিক নয়।
এই অবস্থাকে একটি তারের উপমা দিয়ে বোঝানো যায়। যদি তারটি অতিরিক্ত টান দেওয়া হয়, তবে তা ছিঁড়ে যায়; আর যদি খুব ঢিলে রাখা হয়, তবে তা থেকে কোনো সুর বের হয় না। সঠিক সুরের জন্য মধ্যম টান প্রয়োজন। তেমনি সত্য উপলব্ধির জন্যও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা জরুরি।
আমার দীর্ঘ সময়ের গবেষণাময় অভিজ্ঞতার আলোকে এই লিখাটি লিখেছি দীর্ঘ অধ্যায়ন ও ক্ষুত্র সম্যক জ্ঞানের মধ্যদিয়ে সেইদিক থেকে সমাপনী কথায় বলবো, অন্তর্দৃষ্টির পথে অগ্রসরতা অরহৎ চিনা কোনো বাহ্যিক দৃষ্টির বিষয় নয়; এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিষয়।
প্রকৃত অরহৎ নিজেকে প্রচার করেন না; তার জীবনই তার প্রমাণ। তার চিত্ত সম্পূর্ণ নির্মল, শান্ত এবং মুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—অরহৎকে সত্যিকারভাবে চিনতে হলে নিজেকেও সেই পথে অগ্রসর হতে হবে। অশুদ্ধ চিত্ত দিয়ে শুদ্ধতাকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
যেমন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আলোকে চেনা যায় না—আলোকে চেনার জন্য নিজেকেও আলোর দিকে অগ্রসর হতে হয়।
অতএব, অরহৎকে খুঁজতে হলে বাইরে নয়, নিজের অন্তরের গভীরে অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। কারণ যে নিজেকে জিতেছে, সেই সত্যকে চিনতে পারে।