মিথ্যাদৃষ্টি, ভ্রান্তধারনা ও তান্ত্রিকতায় প্রতারনা! বুদ্ধ দর্শন বিশ্বাস করে কি?
সম্পাদনায়, কলমে, সংকলনে ও প্রকাশনায় স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে,
অধ্যক্ষ, ঐতিহাসিক পুণ্যতীর্থ আবদুল্লাপুর শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার,
সম্পাদক ও প্রকাশক, জ্ঞান অন্বেষণ অনলাই নিউজ পোর্টাল ।
মিথ্যাদৃষ্টি, ভ্রান্তধারনা ও তান্ত্রিকতায় প্রতারনা! বুদ্ধ দর্শন বিশ্বাস করে কি? আজকে এই বিষয়ে আলোচনা করছি। একটি লিখা লিখতে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা করতে হয়, চিন্তা করতে হয়, অনেক গ্রন্থের সহযোগিতা নিতে হয়, টাইপ করতে হয়, বার বার পড়তে হয়, ভুল সংশোধন করতে হয় তারপর প্রকাশনা করতে হয় সুতরাং সম্পাদনা ও সংকলন অনেক কষ্টদায়ক। এই কষ্ট তখনই সার্থক হয় যখন পাঠক পড়েন এবং জ্ঞান চর্চা করেন। কেউ কপি করলে আশা করি সম্পাদনা, প্রকাশনা ও সংকলকের মূল্যায়ন করবেন।
অনেকে মনে করতে পারেন কোন ব্যক্তিকে উপলক্ষ করে এই সমস্ত লিখাগুলি সংকলন, সম্পাদনা ও প্রকাশনা করি। প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যক্তিকে উপলক্ষ করে এই লিখাগুলি লিখা হয় না। একজন বিনয়শীল ভিক্ষু হিসাবে ধর্ম বিনয় অধ্যায়ন করতে গিয়ে নিজের জ্ঞানচর্চার পরিধি বিস্তার করার জন্য অবশর সময়ে বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষনা মাত্র।
বর্তমান সময় বাংলা ভাষায় কথা বলা বৌদ্ধ সম্পাদায়ের জন্য সুবর্ণযুগ। এক সময় ত্রিপিটকের বিভিন্ন খন্ড পাওয়া গেলেও সুন্দর গুছানো ভাবে বাংলা অনুবাদ সংযুক্ত গ্রন্থ বড়ই অভাব ছিলো। পন্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির ভান্তের হাত ধরে এই দেশে বাংলা ত্রিপিটকের এক অনবদ্য পরিবর্তন এসেছে যা পরবর্তিতে বর্তমান তরুন ভিক্ষু সংঘ ও অভিজ্ঞ কিছু দায়ক সংঘের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনেক ঘরে পিটিকীয় গ্রন্থ পাওয়া যাচ্ছে।
আবদুল্লাপুর শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের আওতাধীন প্রতিটি পরিবারের মধ্যে কোন না কোন পিটকীয় গ্রন্থ পাওয়া যাবে কারন আমি বিশ্বাস করি সঠিক সুন্দর বিনয় ধর্ম অর্জন করতে পড়ার কোন বিকল্প নাই। সেই জন্য ঘরে ঘরে গ্রন্থের ব্যবস্থাও করেছি। তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ভাবে।
সঠিক জ্ঞান চর্চা করার জন্য গ্রন্থ অধ্যায়ন করা বেশি বেশি প্রয়োজন। মানুষ যতই জানবে ততই সমাজ থেকে অন্ধকার দুর হবে, সত্য মিথ্যা বুঝার ক্ষমতা লাভ করবে এবং ধর্মের কল্যান হবে। মানুষের সঠিক ধর্মজ্ঞানের কারনে অনেকাংশে ধর্মযাচকেরাও মিথ্যা অভিনয় করে, ধর্মের অপব্যবহার করে বিভিন্ন ভাবে প্রতারনা করে যাচ্ছে এবং সমাজ, গ্রাম ও ধর্মে বিভাজন সৃস্টি করে যাচ্ছে।
এই সমস্ত বিষয়ে আরো বিস্তর জ্ঞান লাভ করা যাবে বিনয়পিটকের মহাবর্গ গ্রন্থ ও ভিক্ষুব্রত বিধি ১ ও ২ খন্ড গ্রন্থ অধ্যায়ন করলে তবে আমি বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য চেষ্টা করি। তাহলে চলুন পিটকীয় ভাবে অভিমত আকারে নিজের জ্ঞান পরিধি বিস্তার করি অধ্যায়নের মাধ্যমে।
প্রশ্ন : তান্ত্রিকতা ও ভাগ্যগণনা সম্পর্কে বুদ্ধের অভিমত কী?
উত্তর : ভাগ্য গণনা, রক্ষাকবচ এবং গৃহনির্মাণ ও যাত্রায় শুভ-অশুভ দিন ধার্যকরণকে বুদ্ধ অর্থহীন কুসংস্কার আখ্যায়িত করে তাঁর অনুসারীদের এই আচারাদি পালন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
প্রশ্ন : এতে কোনো সত্যতা না থাকলে অনেকে কেন তান্ত্রিকতা বিশ্বাস ও চর্চা করেন?
উত্তর : লোভ, ভয় ও অজ্ঞতার কারণে এগুলির চর্চা করা হয়। বুদ্ধের উপদেশ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, এক টুকরা কাগজ, ধাতব মুদ্রাখণ্ড, কিংবা অন্য কোনো পাথর কণা অপেক্ষা মানুষের মহৎ হৃদয়বৃত্তিজাত কুশলকর্ম অনেক বেশি শক্তিশালী। বুদ্ধের গভীর সাধনালব্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান-আলোকে মানুষ সদাচার, করুণা, ক্ষমা, ধৈর্য, ত্যাগ ও সততাধর্মী জীবনাচারের সাহায্যে প্রকৃতপক্ষে অশুভ ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। তাই তান্ত্রিকতার আচার-অনুষ্ঠানকে তিনি নিম্নমানের বৃত্তি বা জীবিকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রশ্ন : কিছু তান্ত্রিকতা কার্যকরী বলে শোনা যায়, তাই নয় কি?
উত্তর : লক্ষ করবেন, যাঁরা ওই পন্থায় জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের দাবি হলো ভাগ্য পরিবর্তন করে তারা সৌভাগ্যের গ্যারান্টি দিতে পারেন। তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে তারা নিজেরা কেন বিপুল সম্পত্তির অধিকারী নন? তাঁরা কেন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন না? কেন প্রতি সপ্তায় লটারী জিতে মোটা অর্থ লাভ করেন না? আসল কথা হলো তাদের এইটুকু ভাগ্য যে, কিছু বোকা বা অজ্ঞ মানুষ পাথর কিংবা রক্ষাকবচ ক্রয় করে তাঁদের জীবিকা অর্জনে সাহায্য করেন। এখানে সাধারণ মানুষের মনে অলীক বিশ্বাস ও মোহ সৃষ্টি করে তা স্বার্থসিদ্ধির কজে লাগানো হয় এবং তান্ত্রিক গন প্রতারনা করে কিছু কালো ও পাপে অর্জিত সম্পত্তি লাভ করেন।
প্রশ্ন : অনেক ভিক্ষুরাই তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ, তোমা করে জীবিকা নিবাহ করে সেই ক্ষেত্রে বুদ্ধ কি বলেন?
উত্তর : বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ক্ষেত্রে তন্ত্র-মন্ত্র বা তাবিজ, তোমা, বুদ্ধ কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন। বুদ্ধ ভিক্ষুশীলে একদম অন্তরায় বলেছেন তন্ত্র-মন্ত্র ও তাবিজ কবজকে। যে সমস্ত ভিক্ষুগন তন্ত্র-মন্ত্র করেন জীবিকা নির্বারন করেন তাদের মৃত তালগাছের সাথে তুলনা করেছেন। তাল গাছে মাথা কোন কারনে পচে গেলে ঐ তালগাছকে যতই যত্ন করা হোক না কেন, সেই তালগাছ আর কখনো জীবন ফিরে পাবে না, ঠিক তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ, তোমা করে যে সমস্ত ভিক্ষুরা মিথ্যা ও প্রতারনা মূলক জীবিকা নিবাহ করে তাদের বুদ্ধ মৃত তাল গাছের সাথে তুলনা করেছেন। এক কথা বিনয় পিটকানুসারে পারাজিকা গ্রস্থ অ-ভিক্ষু বলেছেন বুদ্ধ।
প্রশ্ন : ভাগ্য বলে কি কিছুই নেই?
উত্তর : ভাগ্যবিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, এমন অদৃশ্য শক্তিকে, যা খেয়ালখুশিমতো মানুষের ভালো-মন্দ নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধ দর্শন ও বিজ্ঞানের কার্যকারণ-প্রক্রিয়া মতে জগৎ জীবনে সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনো ঘটনা ঘটে না। এখানে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কোনো অবকাশ নেই। দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে রোগাগ্রস্ত হয়। এখানে সুনির্দিষ্ট রোগ হলো ঘটনা; সুনির্দিষ্ট রোগ জীবাণু এবং দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা হলো কারণ।
চিকিৎসার সাহায্যে কারণ দূর করলে রোগ নিরাময় হয়। এখানে রোগ জীবাণু ও ওষুধ এই দুইটি জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ করে না। তান্ত্রিক শাস্ত্রের কোনো কাগজের টুকরো বা ধাতব পদার্থখণ্ড, কিংবা পাথরে লিখা কোনো ধর্মীয় বাণী কিংবা পাঠ করে মন্ত্র ধারণ করলে রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময়ে কার্যকরী হবার কোনো কারণ নেই। মানুষের কুশল-অকুশল ঘটনার কারণ হলো : মানুষের কৃত কুশল-অকুশল জীবনাচরণধর্মী কর্ম। যাঁরা অলৌকিকতার ভাগ্যে বিশ্বাস করেন, তাঁরা সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত অর্থসম্পদের চাহিদার পেছনে অন্তহীন অসন্তুষ্টি নিয়ে ছুটে চলেন।
বুদ্ধ বলেছেন :
“সুশিক্ষিত, সুদক্ষ, বিভিন্ন বিষয়ে সুনিপুণ এবং সুভাষী হওয়া উত্তম মঙ্গলকারক, পরম সৌভাগ্যদায়ী।
মাতাপিতার সেবা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ভরণপোষণ, সাধাসিধে জীবন যাপন করা উত্তম মঙ্গল, পরম সৌভাগ্যদায়ী।
ত্যাগী হওয়া, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য এবং নিদোর্ষ কর্মসম্পাদন করা উত্তম মঙ্গল, পরম সৌভাগ্যদায়ী।
কৃতজ্ঞ, সন্তুষ্ট, শ্রদ্ধাবান, বিনম্রী মানবতাবোধ হওয়া, সদ্ধর্ম শ্রবণ করা উত্তম মঙ্গল এবং পরম সৌভাগ্যদায়ী। উক্ত কর্মক্রিয়াই মানুষের শুভ-অশুভ ফলাফল প্রদান করতে সক্ষম; অন্য কিছু নয়”।
অসৎ বন্ধুর সঙ্গ বর্জন করো, সৎ বন্ধুর সঙ্গ লাভ করো, মহৎ ব্যক্তির সংস্পর্শে গমন করো।
যিনি পণ্ডিত ও প্রবীণ ব্যক্তিদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন, তিনি দীর্ঘায়ু, যশ, সুখ, শান্তিসম্পদ লাভ করেন।