1. arkobd1@gmail.com : arkobd :
  2. dharmobodi88@gmail.com : স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে : স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে
  3. asyrvwvn@tacoblastmail.com : NARYTHY496NEHTYHYHTR :
  4. sumibaruasushmita@gmail.com : Sumi barua :
২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| শরৎকাল| রবিবার| রাত ৪:০০
শিরোনামঃ
বিপিএম (সাহসিকতা) পদকে ভূষিত অর্ণব বড়ুয়া মৃত্যুর সময় মানুষের মন কেমন হয় এবং মৃত্যু কত প্রকার পুনর্জন্ম আছে—বৌদ্ধ দর্শনের অবস্থান সুস্পষ্ট সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম: সংঘবদ্ধ জাতি ও আদর্শ সমাজ গঠনের বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি সম্মান আয়নার মতো—আপনি যেমন দেবেন, তেমনই ফিরে পাবেন নিজের মন-চিত্তকে জানা: বুদ্ধদর্শনের আলোকে আত্ম-পর্যবেক্ষণ ও সত্য উপলব্ধি কর্মফল, কর্মনিয়তি এবং তথাগত বুদ্ধের জীবনদর্শন: ধর্মের পরিহানির মূল কারণ: না জেনে, না বুঝে পণ্ডিত হওয়ার প্রবণতা প্রাণী হত্যা ও তার চার প্রকার পাপ: বৌদ্ধধর্মের আলোকে  আলোচনাটি করলাম মা-বাবা: জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ — বৌদ্ধধর্মের আলোকে এই আলোচনা

মৃত্যুর সময় মানুষের মন কেমন হয় এবং মৃত্যু কত প্রকার

ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে
  • প্রকাশিত হয়েছেঃ শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬,
  • 90 বার দেখা হয়েছে

মৃত্যুর সময় মানুষের মন কেমন হয় এবং মৃত্যু কত প্রকার


কলমে- স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে-


ত্রিপিটক ও থেরবাদী বৌদ্ধদর্শনের আলোকে


ভূমিকা

জন্ম হয়েছে মানেই একদিন মৃত্যু আসবে—এই অনিবার্য সত্য থেকে পৃথিবীর কোনো প্রাণীই মুক্ত নয়। রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, জ্ঞানী-অজ্ঞানী, তরুণ-বৃদ্ধ—সকলের দেহই জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অধীন। তথাগত গৌতম বুদ্ধ মৃত্যুকে কেবল ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখাননি; বরং মৃত্যুর অনিত্য সত্যকে উপলব্ধি করে কীভাবে আসক্তি, তৃষ্ণা ও অবিদ্যা থেকে মুক্ত হওয়া যায়, সেই পথ তিনি শিক্ষা দিয়েছেন।

অঙ্গুত্তর নিকায়ের পঞ্চম নিপাতের সাতান্ন নম্বর সূত্রে বুদ্ধ পাঁচটি বিষয় বারবার স্মরণ করতে বলেছেন—আমি জরা-ধর্মী, ব্যাধি-ধর্মী, মরণ-ধর্মী; প্রিয় ও মনোমত বিষয় থেকে একদিন বিচ্ছিন্ন হতে হবে; এবং আমি আমার কর্মের অধিকারী ও কর্মের উত্তরাধিকারী। এই স্মরণ ভয় সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং জীবনের প্রতি অপ্রমাদ, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য।


 মৃত্যুর সময় মানুষের মন কেমন হয়?

বৌদ্ধধর্মে মনকে কোনো চিরস্থায়ী আত্মা হিসেবে দেখা হয় না। চিত্ত প্রতিমুহূর্তে উৎপন্ন ও বিলীন হয় এবং কারণ-কার্য সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় চিত্তপ্রবাহ চলতে থাকে। তাই মৃত্যু মানে কোনো স্থায়ী আত্মার দেহ থেকে বের হয়ে যাওয়া নয়; বরং একটি জীবনের চিত্তপ্রবাহের অবসান এবং কর্মের কার্যকারণ অনুসারে পরবর্তী অস্তিত্বে প্রতিসন্ধি চিত্তের উদয়।

মৃত্যুর সময় প্রত্যেক মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতা একরকম হবে—এমন কথা ত্রিপিটকে বলা হয়নি। কেউ শান্ত থাকতে পারেন, কেউ ভীত বা অস্থির হতে পারেন, কেউ প্রিয়জনকে স্মরণ করতে পারেন, আবার কেউ ধর্মীয় বিষয় স্মরণ করে মনকে স্থির রাখতে পারেন। তাই “মৃত্যুর দশ-পনেরো মিনিট আগে প্রত্যেক মানুষের মন শান্ত হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট তিনটি দৃশ্যের একটি দেখা যায়”—এটিকে সরাসরি বুদ্ধবচন বলা ঠিক নয়।

তবে থেরবাদী অভিধর্মে মৃত্যুকালীন চিত্তপ্রক্রিয়া বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং সেখানে কর্ম, কর্মনিমিত্ত ও গতিনিমিত্ত—এই তিন ধরনের আলম্বনের আলোচনা পাওয়া যায়।


কর্ম

অঙ্গুত্তর নিকায়ের ষষ্ঠ নিপাতের ত্রেষট্টিতম সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন—

“ভিক্ষুগণ, চেতনাকেই আমি কর্ম বলি।”

অর্থাৎ শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, কাজটির পেছনে যে ইচ্ছা বা মানসিক চেতনাও রয়েছে, তা কর্মের মূল ভিত্তি। মানুষ দেহ, বাক্য ও মন দ্বারা কর্ম করে এবং সেই কর্মের ফল কখনো এই জীবনেই, কখনো পরবর্তী জীবনে এবং কখনো আরও পরবর্তী সময়ে পরিপক্ব হতে পারে।

এই কারণে মৃত্যুর সময় কোনো কর্মের আলম্বন চিত্তে উদিত হওয়ার কথা থেরবাদী অভিধর্মে বলা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুর সময় নিজের জীবনের সম্পূর্ণ ঘটনা সিনেমার মতো দেখতে পাবেন।


 কর্মনিমিত্ত

কোনো কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত বস্তু, দৃশ্য, শব্দ বা মানসিক আলম্বনকে কর্মনিমিত্ত বলা হয়।

যেমন, শিকার করার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে শিকারের উপকরণ বা সংশ্লিষ্ট দৃশ্য কর্মনিমিত্ত হতে পারে; আবার দান, ধর্মসেবা বা বুদ্ধপূজায় অভ্যস্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বস্তু বা দৃশ্য চিত্তে উদিত হতে পারে।

তবে এগুলো উদাহরণমাত্র। “অমুক ব্যক্তি মরার সময় অবশ্যই অমুক জিনিস দেখবে”—এমন নিশ্চয়তা বৌদ্ধশাস্ত্র দেয় না।


গতিনিমিত্ত

মৃত্যুর পর যে গতি বা অস্তিত্ব লাভ হতে পারে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো আলম্বনকে গতিনিমিত্ত বলা হয়। থেরবাদী অভিধর্মীয় ব্যাখ্যায় বিভিন্ন গতি অনুযায়ী বিভিন্ন আলম্বনের কথা বলা হয়েছে।

তবে লোকমুখে প্রচলিত স্বর্গ, নরক বা পুনর্জন্মের দৃশ্যের নানা বর্ণনাকে ত্রিপিটকের অব্যর্থ বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। কর্মবিপাক অত্যন্ত গভীর বিষয়।

অঙ্গুত্তর নিকায়ের চতুর্থ নিপাতের সাতাত্তর নম্বর সূত্রে বুদ্ধ কর্মবিপাককে এমন বিষয়ের মধ্যে রেখেছেন, যা সাধারণ চিন্তাশক্তি দিয়ে সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা যায় না। তাই কর্মের ফল সম্পর্কে অতি সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।


মৃত্যুর সময় কি শেষ চিন্তাই পুনর্জন্ম নির্ধারণ করে?

শুধু মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের চিন্তাকে আলাদা করে দেখলে বৌদ্ধ কর্মতত্ত্ব অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। মৃত্যুকালীন চিত্ত থেরবাদী অভিধর্মে গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের পূর্বকৃত কর্ম, দীর্ঘদিনের মানসিক অভ্যাস এবং কর্মের শক্তিও কর্মবিপাকের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অঙ্গুত্তর নিকায়ের ষষ্ঠ নিপাতের ত্রেষট্টিতম সূত্রে বুদ্ধ কর্মের ফল বর্তমান জীবন, পরবর্তী জীবন অথবা আরও পরবর্তী সময়ে পরিপক্ব হতে পারে বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

তাই “মৃত্যুর সময় রাগ ছিল, তাই নিশ্চিত দুর্গতি” অথবা “মৃত্যুর সময় হাসছিলেন, তাই নিশ্চিত সুগতি”—এ ধরনের সরল সিদ্ধান্ত বুদ্ধের কর্মতত্ত্বের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়।


 মৃত্যু কত প্রকার?

থেরবাদী অভিধর্মের ব্যাখ্যায় মৃত্যুকে কার্যকারণগত দিক থেকে চার প্রকার বলা হয়—

১. আয়ুক্ষয় মৃত্যু ২. কর্মক্ষয় মৃত্যু ৩. উভয়ক্ষয় মৃত্যু ৪. উপচ্ছেদক মৃত্যু

উল্লেখ্য, এই চার ভাগের শ্রেণিবিন্যাস সূত্রপিটকের কোনো একটি সূত্রে বুদ্ধের সরাসরি প্রদত্ত তালিকা নয়; বরং থেরবাদী অভিধর্ম ও পরবর্তী শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণের জন্য এটি সুসংবদ্ধ হয়েছে।


আয়ুক্ষয় মৃত্যু

যখন জীবনের নির্ধারিত আয়ু শেষ হয় এবং তার ফলে জীবনপ্রবাহের অবসান ঘটে, তাকে আয়ুক্ষয় মৃত্যু বলা হয়।

এটি বোঝাতে প্রদীপের সলতের উপমা দেওয়া হয়—সলতের কার্যক্ষমতা শেষ হলে প্রদীপের আলো নিভে যায়। এখানে বিষয়টি শুধু বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যু বোঝানোর জন্য নয়; বরং অভিধর্মের কার্যকারণগত ব্যাখ্যার অংশ।


কর্মক্ষয় মৃত্যু

যে উৎপাদক কর্মের কারণে একটি নির্দিষ্ট জীবনপ্রবাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার কার্যক্ষমতা শেষ হলে তাকে কর্মক্ষয় মৃত্যু বলা হয়।

এটি বোঝাতে প্রদীপের তেলের উপমা দেওয়া হয়—সলতে থাকলেও তেল শেষ হলে প্রদীপ জ্বলতে পারে না।

তবে এই ধারণাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি রোগ, হৃদ্‌রোগ বা অন্য শারীরিক কারণে মারা গেলে সেই শারীরিক কারণকে অস্বীকার করে শুধু কর্মক্ষয় বলা বৌদ্ধ শিক্ষার যথাযথ প্রয়োগ নয়।


উভয়ক্ষয় মৃত্যু

যখন আয়ু এবং জীবনধারণকারী উৎপাদক কর্মের কার্যক্ষমতা একই সময়ে শেষ হয়, তখন তাকে উভয়ক্ষয় মৃত্যু বলা হয়।

প্রদীপের উপমায় বলা যায়—তেলও শেষ হয়েছে, সলতেও শেষ হয়েছে; ফলে প্রদীপের আলো নিভে গেছে।


উপচ্ছেদক মৃত্যু

জীবনের স্বাভাবিক আয়ু বা উৎপাদক কর্মের কার্যকাল শেষ হওয়ার আগেই কোনো শক্তিশালী বিরোধী কর্মের প্রভাবে জীবনপ্রবাহ ছিন্ন হলে তাকে উপচ্ছেদক মৃত্যু বলা হয়।

সাধারণভাবে এটিকে অকালমৃত্যুর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করা হয়।

তবে প্রতিটি দুর্ঘটনা, হত্যা, আত্মহত্যা বা অকালমৃত্যুকে নিশ্চিতভাবে পূর্বজন্মের কোনো নির্দিষ্ট পাপের ফল বলে ঘোষণা করা উচিত নয়। কর্মের কার্যকারণ অত্যন্ত জটিল এবং কর্মবিপাক সম্পর্কে বুদ্ধ নিজেই সতর্ক করেছেন।


মৃত্যুস্মরণ বা মরণসতি

বৌদ্ধধর্মে মৃত্যুকে স্মরণ করার উদ্দেশ্য হতাশা সৃষ্টি করা নয়; বরং অপ্রমাদ সৃষ্টি করা।

প্রতিদিন নিজেকে স্মরণ করানো যেতে পারে—

আমি জরা-ধর্মী।
আমি ব্যাধি-ধর্মী।
আমি মরণ-ধর্মী।
প্রিয়জন ও প্রিয় বস্তু থেকে আমাকে একদিন বিচ্ছিন্ন হতে হবে।
আমি আমার কর্মের অধিকারী এবং কর্মের উত্তরাধিকারী।

এই স্মরণ মানুষকে জীবনের প্রতি আরও সচেতন করে এবং অহংকার, আসক্তি ও অসতর্কতা কমাতে সাহায্য করে।


মৃত্যুর আগে আমাদের কী করা উচিত?

মৃত্যুর সময় ভালো চিত্ত পাওয়ার জন্য শেষ মুহূর্তে কোনো বিশেষ কৌশলের ওপর নির্ভর না করে জীবনের প্রতিদিনের চিত্তকে প্রশিক্ষিত করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

দান করুন, শীল পালন করুন, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকুন, অন্যের ক্ষতি না করার চেষ্টা করুন, মৈত্রী ও করুণা চর্চা করুন, বুদ্ধের গুণ স্মরণ করুন, ধর্ম শ্রবণ করুন এবং ধ্যানের মাধ্যমে নিজের চিত্তকে পর্যবেক্ষণ করুন।

কারণ যে মন সারাজীবন রাগ, লোভ ও বিদ্বেষে অভ্যস্ত হয়েছে এবং যে মন সারাজীবন মৈত্রী, করুণা ও প্রজ্ঞায় অভ্যস্ত হয়েছে—এই দুই মনের প্রবণতা এক নয়।


মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তির পাশে কী করা উচিত?

কেউ মৃত্যুশয্যায় থাকলে তার চারপাশে অযথা আতঙ্ক, চিৎকার বা মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি না করে শান্ত পরিবেশ তৈরি করা ভালো।

তার সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলা, প্রিয়জনদের প্রতি ক্ষমা ও মৈত্রীর অনুভূতি জাগাতে সাহায্য করা, বুদ্ধের গুণ স্মরণে সহায়তা করা এবং সে যদি ধর্মশ্রবণ বা ত্রিশরণ স্মরণ করতে চায়, তার সেই ইচ্ছাকে সম্মান করা যেতে পারে।

“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি”—এই ত্রিশরণ স্মরণ কিংবা মৈত্রীভাবনা একজন বৌদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির চিত্তকে শান্ত রাখতে সহায়ক হতে পারে।

তবে কাউকে জোর করে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করানো উচিত নয়; মৃত্যুপথযাত্রীর মানসিক অবস্থা ও বিশ্বাসকে সম্মান করাই প্রধান।


মৃত্যুর সময় কান্না করা কি পাপ?

প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক হওয়া মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। তাই “মৃত্যুর সময় কেউ কাঁদলে মৃত ব্যক্তি দুর্গতিতে যাবে”—এমন কথা বুদ্ধের সরাসরি শিক্ষা হিসেবে বলা ঠিক নয়।

মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের সময় শোকাহত মানুষের উল্লেখ যেমন রয়েছে, তেমনি অনিত্যতা উপলব্ধি করে শান্ত থাকা ব্যক্তিদের কথাও রয়েছে।

অতএব শোককে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই; বরং অতিরিক্ত বিলাপে ডুবে না থেকে অনিত্যতার সত্য উপলব্ধি করে মৈত্রী ও ধর্মচিন্তার পরিবেশ সৃষ্টি করাই বৌদ্ধ অনুশীলনের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।


বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ থেকে শিক্ষা

দীঘ নিকায়ের মহাপরিনির্বাণ সূত্র বুদ্ধের জীবনের শেষ পর্যায় ও মহাপরিনির্বাণের প্রধান বিবরণ।

বুদ্ধ নিজের দেহকেও অনিত্যতার নিয়মের বাইরে রাখেননি। তাঁর শেষ শিক্ষার অন্যতম বিষয় ছিল—সব সংখারই ক্ষয়ধর্মী এবং তাই অপ্রমাদী হয়ে সাধনা করতে হবে।

অর্থাৎ বুদ্ধের জীবন আমাদের শেখায়—দেহ যত মহান হোক, যত পবিত্র হোক, যত শক্তিশালী হোক, উৎপন্ন সবকিছুর মতো দেহও অনিত্য।


মৃত্যুকে জয় করার প্রকৃত অর্থ

বৌদ্ধধর্মে মৃত্যুকে জয় করার অর্থ শরীরকে অমর করা নয়। মৃত্যুর গভীর অর্থ হলো জন্ম-মৃত্যুর দুঃখের মূল কারণ—তৃষ্ণা, আসক্তি ও অবিদ্যা—দূর করে নির্বাণের দিকে অগ্রসর হওয়া।

তাই বুদ্ধের শিক্ষা শুধু “মৃত্যুর পরে কোথায় জন্ম নেব”—এই প্রশ্নের উত্তর নয়; বরং তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে দুঃখের কারণকে বুঝে সেই দুঃখের সম্পূর্ণ নিরোধের পথে অগ্রসর হওয়া যায়।

এই পথই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ—সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রয়াস, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।


উপসংহার

মৃত্যু একদিন আমাদের প্রত্যেকের কাছেই আসবে। আমরা জানি না কখন সেই মুহূর্ত আসবে, কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে জন্মের সঙ্গে মৃত্যুর সম্ভাবনা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

তাই প্রশ্ন শুধু “মৃত্যুর সময় আমি কী দেখব?”—এটি নয়; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—“মৃত্যুর আগে আমি কেমন মানুষ হয়ে উঠছি?”

আজ আমার মনে কতটা মৈত্রী আছে, কতটা করুণা আছে, কতটা লোভ ও রাগ আছে, আমি কাকে কষ্ট দিয়েছি, কার কাছে ক্ষমা চাওয়া দরকার এবং আজ আমি কী একটি কল্যাণকর কাজ করতে পারি—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই মৃত্যুস্মরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

অঙ্গুত্তর নিকায়ের শিক্ষার আলোকে বলা যায়—আমরা আমাদের কর্মের অধিকারী এবং কর্মের উত্তরাধিকারী। তাই মৃত্যুকে ভয় করে নয়, মৃত্যুর অনিত্য সত্যকে উপলব্ধি করে জীবনকে শুদ্ধ করাই বুদ্ধের পথ।

দান করুন, শীল পালন করুন, মৈত্রী চর্চা করুন, করুণা জাগ্রত করুন, ধ্যান করুন এবং প্রজ্ঞার পথে অগ্রসর হোন।

মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে শান্ত মন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, আজকের প্রতিটি মুহূর্তে শান্ত ও কল্যাণময় মন গড়ে তুলুন।

কারণ—

মৃত্যুর প্রস্তুতি মৃত্যুর দিন থেকে শুরু হয় না; মৃত্যুর প্রস্তুতি শুরু হয় জীবনের প্রতিটি সচেতন মুহূর্ত থেকে।

জন্ম অনিত্য, যৌবন অনিত্য, দেহ অনিত্য, সম্পদ অনিত্য, সম্পর্ক অনিত্য—সমস্ত সংখারই উদয় ও বিলয় রয়েছে। এই অনিত্যতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে যদি লোভ কমে, রাগ কমে, বিদ্বেষ কমে এবং মৈত্রী, করুণা ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি পায়, তাহলেই মৃত্যুস্মরণ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে।

সকল প্রাণী সুখী হোক।

সকল প্রাণী দুঃখ থেকে মুক্ত হোক।

সকল প্রাণীর চিত্ত মৈত্রী ও করুণায় পরিপূর্ণ হোক।

সকলের মধ্যে প্রজ্ঞার আলো উদিত হোক।

সাধু। সাধু। সাধু।


প্রধান সূত্র ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি

অঙ্গুত্তর নিকায়, পঞ্চম নিপাত, সাতান্ন নম্বর সূত্র — জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, বিচ্ছেদ এবং কর্মের অধিকারী হওয়ার বিষয় স্মরণ।

অঙ্গুত্তর নিকায়, ষষ্ঠ নিপাত, ত্রেষট্টিতম সূত্র — চেতনাই কর্ম এবং কর্মের ফল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

অঙ্গুত্তর নিকায়, চতুর্থ নিপাত, সাতাত্তর নম্বর সূত্র — কর্মবিপাকের গভীরতা ও অচিন্তনীয়তা।

দীঘ নিকায়, ষোড়শ সূত্র, মহাপরিনির্বাণ সূত্র — বুদ্ধের শেষ জীবন, মহাপরিনির্বাণ এবং সংখারের অনিত্যতা।

ধম্মপদ, একুশ থেকে বত্রিশ নম্বর গাথা, অপ্রমাদবর্গ — অপ্রমাদ, সতর্কতা ও মৃত্যুর সত্য।

বিশুদ্ধিমার্গ — পরবর্তী থেরবাদী শাস্ত্রীয় গ্রন্থ; কর্ম, মৃত্যুচিত্ত, পুনর্জন্ম এবং মৃত্যুকালীন আলম্বন সম্পর্কে বিস্তৃত ব্যাখ্যা।

অভিধর্মার্থসংগ্রহ — মৃত্যুচিত্ত, চিত্তবীথি, কর্ম, কর্মনিমিত্ত ও গতিনিমিত্ত সম্পর্কে সুসংবদ্ধ অভিধর্মীয় আলোচনা।

শাস্ত্রীয় সতর্কতা

কর্ম, কর্মনিমিত্ত, গতিনিমিত্ত এবং মৃত্যুর চার প্রকার—এসবকে সূত্রপিটকের সরাসরি বুদ্ধবচন এবং পরবর্তী থেরবাদী অভিধর্মীয় ব্যাখ্যা—এই দুই স্তর পৃথকভাবে বোঝা উচিত। এতে বুদ্ধের মূল শিক্ষার যথাযথ মর্যাদা বজায় থাকে এবং পরবর্তী আচার্যদের বিশদ ব্যাখ্যাও সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এ জাতীয় আরো খবর..

আজকের দিন-তারিখ

  • রবিবার (রাত ৪:০০)
  • ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)

জ্ঞানঅন্বেষণ © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।