কলমে- ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে-
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, পুরাতন চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম
অধ্যক্ষ গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারী
ভূমিকা
বৌদ্ধধর্ম কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক ঐতিহ্য কিংবা উপাসনালয়কেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; এটি মানবজীবনের দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, দুঃখ নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কে সুগভীর দার্শনিক বিশ্লেষণসমৃদ্ধ এক মহান জীবনদর্শন। এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা। শীলের মাধ্যমে মানুষের দৈহিক ও বাচনিক আচরণ পরিশুদ্ধ হয়, সমাধির মাধ্যমে চিত্ত সংযত ও স্থির হয় এবং প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানুষ জীবনের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। গৌতম বুদ্ধের প্রবর্তিত এই মহান মুক্তির পথ আড়াই হাজার বছরেরও অধিক সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষের জীবনকে নৈতিকতা, মানবিকতা, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা ও প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বুদ্ধের এই মহান দর্শন কীভাবে একটি সমাজে জীবন্ত থাকবে? কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ধর্মীয় জ্ঞান, শীলাচার, বিনয়, সাধনা ও ঐতিহ্য প্রবাহিত হবে? কীভাবে মানুষ বুদ্ধের দেশনা জানবে, বুঝবে এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ভিক্ষু সংঘ, বুদ্ধ বিহার এবং উপাসক-উপাসিকাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্বের বিষয়টি সামনে চলে আসে। কারণ বৌদ্ধধর্মের ধারাবাহিকতা শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সংঘের আদর্শিক নেতৃত্ব, বিহারকেন্দ্রিক ধর্মীয় শিক্ষা, ত্রিপিটকের সংরক্ষণ, ধর্মপ্রচার এবং গৃহী সমাজের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা।
তাই আজকের বৌদ্ধ সমাজের বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন—শুধু ভিক্ষু হলেই হবে না, প্রয়োজন শীলবান, বিনয়সম্পন্ন, অধ্যয়নশীল ও প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু; শুধু বিহার নির্মাণ করলেই হবে না, প্রয়োজন সেই বিহারে নিয়মিত ধর্মচর্চা ও সাধনার পরিবেশ; শুধু দান ও উৎসব আয়োজন করলেই হবে না, প্রয়োজন ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও আদর্শিক নেতৃত্বের বিকাশ। কারণ শীলবান ও প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু ছাড়া বিহার তার প্রকৃত আধ্যাত্মিক প্রাণশক্তি হারায়, আর বিহার ও ভিক্ষু সংঘের ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়ে পড়লে বৌদ্ধ সমাজের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও অস্তিত্বও ক্রমে সংকটের মুখে পড়ে।
বৌদ্ধ দর্শনে শীলের গুরুত্ব অপরিসীম। শীল মানুষের চরিত্রকে নির্মল করে, অসৎ কর্ম থেকে বিরত রাখে এবং ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে প্রজ্ঞা মানুষকে সত্য উপলব্ধি করতে শেখায়, অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করে এবং অবিদ্যা ও তৃষ্ণার বন্ধন থেকে মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে। এই শীল ও প্রজ্ঞার সমন্বয়েই একজন ভিক্ষুর আদর্শিক জীবন পূর্ণতা লাভ করে।
একজন ভিক্ষুর প্রকৃত মর্যাদা শুধু তাঁর গেরুয়া বস্ত্র, প্রব্রজ্যা গ্রহণ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় শীলবিশুদ্ধতা, বিনয়ানুশীলন, ধর্মীয় জ্ঞান, অধ্যবসায়, ধ্যানসাধনা, সংযম, মৈত্রী ও করুণার মধ্য দিয়ে। যিনি নিজের জীবনকে বুদ্ধের দেশিত আদর্শে পরিচালিত করেন, যিনি ত্রিপিটক অধ্যয়ন করেন, ধর্ম ও বিনয়ের যথার্থ তাৎপর্য উপলব্ধি করেন এবং নিজের অর্জিত জ্ঞান মানুষের কল্যাণে কাজে লাগান, তিনিই প্রকৃত অর্থে একজন আদর্শ ধর্মীয় পথপ্রদর্শক।
একজন শীলবান ভিক্ষু তাঁর জীবনাচরণের মাধ্যমে সমাজকে নৈতিকতার শিক্ষা দেন, আর একজন প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু তাঁর জ্ঞান ও উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষের অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সহায়তা করেন। যখন এই দুই গুণ একই ব্যক্তির মধ্যে বিকশিত হয়, তখন তাঁর উপস্থিতি শুধু একটি বিহারকে নয়, একটি বৃহত্তর সমাজকেও আলোকিত করতে পারে। তাই আমাদের প্রয়োজন শুধু ভিক্ষু সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; প্রয়োজন শীলবান, প্রজ্ঞাবান, বিনয়সম্পন্ন, ধর্মজ্ঞানসমৃদ্ধ ও মানবকল্যাণে নিবেদিত ভিক্ষু সংঘ গড়ে তোলা।
একটি বুদ্ধ বিহার নির্মাণের পেছনে থাকে বহু মানুষের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ত্যাগ, শ্রম, অর্থ ও পুণ্যকামনা। কেউ ভূমি দান করেন, কেউ অর্থ প্রদান করেন, কেউ নির্মাণসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেন, কেউ নিজের শ্রম ও সময় ব্যয় করেন, আবার কেউ জীবনের সঞ্চয় থেকে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু এত ত্যাগ ও অর্থব্যয়ের মাধ্যমে নির্মিত বিহার যদি পরবর্তীকালে নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে, যদি সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি না হয়, যদি শিশু-কিশোর ও তরুণদের বুদ্ধের আদর্শে গড়ে তোলার ব্যবস্থা না থাকে এবং যদি শীলবান, প্রজ্ঞাবান ও যোগ্য ভিক্ষু সংঘের সক্রিয় উপস্থিতি না থাকে, তাহলে সেই বিহার তার মূল উদ্দেশ্য ও আদর্শিক প্রাণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
বিহার অন্ধকার বলার অর্থ এই নয় যে, সেখানে প্রদীপ জ্বলে না, বৈদ্যুতিক আলো নেই কিংবা স্থাপত্যের সৌন্দর্য অনুপস্থিত; বরং এর গভীর অর্থ হলো, যেখানে ধর্মের জ্ঞানচর্চা নেই, সেখানে প্রজ্ঞার আলো অনুপস্থিত; যেখানে শীল ও বিনয়ের অনুশীলন নেই, সেখানে নৈতিকতার আলো দুর্বল; যেখানে ধর্মদেশনা নেই, সেখানে মানুষের অজ্ঞতা দূর করার সুযোগ সংকুচিত; যেখানে ধ্যান ও ভাবনার চর্চা নেই, সেখানে চিত্তশুদ্ধির পথ বাধাগ্রস্ত; আর যেখানে আদর্শিক ভিক্ষু সংঘের সক্রিয় উপস্থিতি নেই, সেখানে বিহারের আধ্যাত্মিক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য অনেকাংশে অপূর্ণ থেকে যায়।
একটি বিহারে প্রতিদিন বুদ্ধমূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বলতে পারে, ধূপ জ্বলতে পারে, ফুল অর্পণ করা হতে পারে, বিশেষ বিশেষ দিনে বিপুল আয়োজনের মাধ্যমে সংঘদান, কঠিন চীবর দান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে পারে; কিন্তু এসব আয়োজনের পাশাপাশি যদি মানুষের চিত্ত পরিবর্তনের জন্য নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা, ত্রিপিটক পাঠ, পঞ্চশীল অনুশীলন, ধ্যানচর্চা ও বুদ্ধের নৈতিক দর্শনের ব্যাখ্যা না থাকে, তাহলে সেই বিহারের প্রকৃত ধর্মীয় উদ্দেশ্য পূর্ণতা পায় না।
সুতরাং বিহারের প্রকৃত আলো শুধু প্রদীপের আলো নয়; বিহারের প্রকৃত আলো হলো শীলের আলো, প্রজ্ঞার আলো, ধর্মীয় জ্ঞানের আলো এবং একজন আদর্শ ভিক্ষুর জীবনাচরণের আলো।
বুদ্ধ, ধম্ম ও সংঘ—এই ত্রিরত্ন বৌদ্ধধর্মের মৌলিক আশ্রয়। বুদ্ধ হলেন জ্ঞানপ্রাপ্ত মহাপুরুষ ও পথপ্রদর্শক, ধম্ম হলো তাঁর আবিষ্কৃত ও দেশিত মুক্তির পথ, আর সংঘ হলো সেই পথের অনুশীলনকারী এবং ধর্মীয় আদর্শের ধারক ও বাহক। তাই সংঘকে কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় কিংবা আনুষ্ঠানিক সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই; সংঘের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে বুদ্ধের শিক্ষা অনুশীলন, বিনয় রক্ষা, ধর্ম প্রচার, ত্রিপিটক অধ্যয়ন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য।
বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর দেশিত ধর্ম ও বিনয়কে কেন্দ্র করেই ভিক্ষু সংঘের মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের ধারা অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন সময়ে সংঘীতির আয়োজন, ত্রিপিটক সংরক্ষণ, ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন, অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও প্রচারের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের জ্ঞানভান্ডার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ থাকলেই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই গ্রন্থ অধ্যয়নকারী, অনুশীলনকারী, ব্যাখ্যাকারী এবং সমাজের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপনকারী যোগ্য ধর্মীয় শিক্ষক ও ভিক্ষু সংঘ।
তবে মনে রাখতে হবে, বুদ্ধের ধর্ম কোনো ব্যক্তি বা স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধম্মের প্রকৃত অস্তিত্ব তার সত্যতা, অনুশীলন ও উপলব্ধির মধ্যে। সংঘের দায়িত্ব হলো সেই ধম্মকে জীবন্ত অনুশীলনের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও প্রচার করা এবং বিহার হলো সেই অনুশীলন ও শিক্ষার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র।
আমাদের অনেকের ধারণায় বুদ্ধ বিহার মানে বুদ্ধমূর্তি, পূজামণ্ডপ, প্রার্থনাকক্ষ, সংঘদান ও ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের স্থান। কিন্তু প্রকৃত অর্থে একটি বিহারের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একটি আদর্শ বিহার হওয়া উচিত ধর্মীয় শিক্ষা, ত্রিপিটক অধ্যয়ন, ধ্যান-ভাবনা, পালি ভাষা শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশ, ধর্মীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।
একটি বিহারে শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত ধর্মীয় পাঠদান, তরুণদের জন্য বুদ্ধদর্শনভিত্তিক আলোচনা, উপাসক-উপাসিকাদের জন্য পঞ্চশীল ও অষ্টশীল পালনের অনুশীলন, সাধারণ মানুষের জন্য ধর্মদেশনা এবং আগ্রহীদের জন্য ধ্যানচর্চার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৌদ্ধ ইতিহাস, জাতক কাহিনি, ত্রিপিটক, পালি সাহিত্য এবং বৌদ্ধ দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ভাষায় শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
যে বিহারে মানুষ শুধু উৎসবের সময় সমবেত হয়, কিন্তু সারা বছর ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধনার কোনো কার্যক্রম থাকে না, সেই বিহার তার সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে না। বিপরীতে যে বিহারে নিয়মিত ধর্মচর্চা, অধ্যয়ন, গবেষণা, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সেবার পরিবেশ রয়েছে, সেই বিহার একটি সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ভিক্ষু সংঘের দায়িত্বকে শুধু বুদ্ধপূজা, সংঘদান, কঠিন চীবর দান, ধর্মীয় উৎসব কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বৌদ্ধধর্মের আদর্শিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন ভিক্ষুর প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের শীল ও বিনয় রক্ষা করা, ধর্ম অধ্যয়ন ও সাধনায় নিয়োজিত থাকা, মানুষের মধ্যে বুদ্ধের দেশনা প্রচার করা এবং সমাজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণে অবদান রাখা।
বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য এবং জগতের প্রতি অনুকম্পার উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রচারে অগ্রসর হতে। এই নির্দেশনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ভিক্ষু জীবনের উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত সাধনা নয়; বরং নিজের সাধনা ও উপলব্ধির আলো অন্যের জীবনেও ছড়িয়ে দেওয়া।
একজন আদর্শ ভিক্ষু মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করবেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তুলবেন, সামাজিক বিরোধ ও বিভেদ নিরসনে মৈত্রীপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন এবং মানুষের মধ্যে অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেবেন। তাঁর ধর্মদেশনা হবে ত্রিপিটক ও বুদ্ধের মূল শিক্ষার আলোকে, তাঁর আচরণ হবে বিনয়সম্মত এবং তাঁর জীবন হবে সাধারণ মানুষের কাছে অনুসরণযোগ্য আদর্শ।
বৌদ্ধ সমাজে উপাসক-উপাসিকাদের অবদান অপরিসীম। যুগে যুগে গৃহী সমাজের দান, শ্রম, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে অসংখ্য বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ভিক্ষু সংঘের জীবনধারণ ও ধর্মচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু গৃহী সমাজের দায়িত্ব শুধু বিহার নির্মাণ, চীবর দান, সংঘদান কিংবা অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নিজেরাও বুদ্ধের শিক্ষা গ্রহণ করা এবং দৈনন্দিন জীবনে তা অনুশীলন করা।
যে উপাসক দান করেন কিন্তু পঞ্চশীল পালনের চেষ্টা করেন না, যে উপাসিকা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন কিন্তু নিজের আচরণে মৈত্রী, করুণা ও সহিষ্ণুতার চর্চা করেন না, যে সমাজ বিহার নির্মাণে আগ্রহী কিন্তু শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করতে উদাসীন, সেই সমাজের ধর্মীয় উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
উপাসক-উপাসিকাদের উচিত বিহারের নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রমে সহযোগিতা করা, যোগ্য ভিক্ষুদের যথাযথ সম্মান ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা, শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা, ভিক্ষু সংঘের অধ্যয়ন ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা এবং বিহারের সম্পদ ও দানসামগ্রীর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
মনে রাখতে হবে, ভিক্ষু সংঘ ধর্মের শিক্ষা দেবেন, আর গৃহী সমাজ সেই শিক্ষা গ্রহণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে কল্যাণময় করে তুলবেন। এই পারস্পরিক সহযোগিতাই বৌদ্ধ সমাজের শক্তিশালী ভিত্তি।
বৌদ্ধ সমাজে ভিক্ষু সংঘের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সংঘের সদস্যদের শীল, বিনয়, জ্ঞান ও সাধনার ধারাবাহিকতা। শুধু পদবি, উপাধি, সামাজিক পরিচিতি কিংবা আনুষ্ঠানিক মর্যাদা একজন ভিক্ষুর প্রকৃত আদর্শিক অবস্থান নির্ধারণ করে না; বরং তাঁর জীবনাচরণ, ধর্মীয় জ্ঞান, বিনয়পালন, সংযম ও মানুষের প্রতি মৈত্রীপূর্ণ আচরণই তাঁর প্রকৃত মর্যাদার পরিচায়ক।
বর্তমান সময়ে ভিক্ষুদের জন্য ত্রিপিটক অধ্যয়ন, পালি ভাষা শিক্ষা, বৌদ্ধ দর্শন, ইতিহাস, ধর্মীয় গবেষণা, অনুবাদ ও আধুনিক সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যার সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একজন ভিক্ষু যত বেশি ধর্মজ্ঞানসমৃদ্ধ হবেন, তত বেশি তিনি সমকালীন মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বুদ্ধের শিক্ষা যুক্তিনির্ভর ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন।
একই সঙ্গে শীল ও বিনয়ের ক্ষেত্রে আত্মসচেতনতা অপরিহার্য। জ্ঞান থাকলেও যদি শীল না থাকে, তাহলে সেই জ্ঞান মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত আস্থা সৃষ্টি করতে পারে না; আবার শীলের অনুশীলন থাকলেও যদি ধর্মীয় জ্ঞানের বিকাশ না ঘটে, তাহলে জটিল ধর্মীয় প্রশ্নের যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শীল ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ই একজন আদর্শ ভিক্ষুর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
একটি বিহারের পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিহার পরিচালনার নামে যদি ব্যক্তিগত অহংকার, পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা পারস্পরিক বিরোধ প্রাধান্য পায়, তাহলে বিহারের ধর্মীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিহার কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কোনো গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রও নয়; এটি একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যার মূল উদ্দেশ্য বুদ্ধের শিক্ষা, সংঘের সাধনা এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
তাই পরিচালনা কমিটির প্রত্যেক সদস্যের উচিত বিহারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা, ভিক্ষু সংঘের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা। একই সঙ্গে ভিক্ষু সংঘেরও উচিত বিহার পরিচালনার ক্ষেত্রে গৃহী সমাজের বাস্তবতা ও দায়িত্বকে সম্মান করা এবং পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।
বিহার ও সংঘের মধ্যে সম্পর্ক হবে শ্রদ্ধা, আস্থা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের; বিরোধ, প্রতিযোগিতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নয়।
একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অস্তিত্ব শুধু বর্তমান প্রজন্মের আনুষ্ঠানিকতা কিংবা উৎসবের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে পরবর্তী প্রজন্ম কতটুকু ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছে, কতটুকু ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করছে এবং সেই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতে বহন করার জন্য কতটুকু প্রস্তুত হচ্ছে তার ওপর।
আজকের শিশু আগামী দিনের উপাসক, উপাসিকা, ধর্মীয় সংগঠক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা প্রব্রজিত জীবনের অনুসারী হতে পারে। কিন্তু তাদের সামনে যদি বুদ্ধের জীবন, ধর্মদেশনা, জাতক কাহিনি, পঞ্চশীল, চার আর্যসত্য, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ এবং মৈত্রী-করুণার শিক্ষা যথাযথভাবে তুলে ধরা না হয়, তাহলে তাদের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের সম্পর্ক ক্রমশ আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
তাই প্রতিটি বিহারে শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা, পালি ভাষার প্রাথমিক পাঠ, বৌদ্ধ ইতিহাস, নৈতিক শিক্ষা ও ধ্যানচর্চার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে মেধাবী ও আগ্রহী তরুণদের ভিক্ষু শিক্ষা, ত্রিপিটক অধ্যয়ন, গবেষণা, অনুবাদ, প্রকাশনা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
আমরা যদি আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান ও আদর্শিক নেতৃত্ব তৈরিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী দিনে বিহার থাকবে, বুদ্ধমূর্তি থাকবে, উৎসবও হয়তো থাকবে; কিন্তু সেই ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা ও পরিচালনা করার মতো যোগ্য মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এটাই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ ধর্মীয় অস্তিত্বের অন্যতম বড় সংকট।
কঠিন চীবর দান, সংঘদান, প্রবারণা পূর্ণিমা, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান বৌদ্ধ সমাজের ঐতিহ্য ও পুণ্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব আয়োজনের মাধ্যমে মানুষ দান, ত্যাগ, শ্রদ্ধা ও সংঘের প্রতি সহযোগিতার মানসিকতা প্রকাশ করে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবই বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়; এগুলো ধর্মচর্চার একটি অংশমাত্র।
বছরে একবার বিপুল অর্থ ব্যয় করে বড় আয়োজন করা হলেও যদি সারা বছর বিহারে ধর্মীয় শিক্ষা, নিয়মিত ধর্মদেশনা, ধ্যানচর্চা, ত্রিপিটক পাঠ কিংবা শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষার কোনো কার্যক্রম না থাকে, তাহলে সেই আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয় সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন অনুষ্ঠান শেষে মানুষ আরও বেশি শীলবান, সংযমী, মৈত্রীপরায়ণ ও ধর্মনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাই উৎসবের জাঁকজমকের পাশাপাশি নিয়মিত ধর্মীয় অনুশীলন, ভিক্ষু সংঘের অধ্যয়ন এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আজ আমাদের নিজেদের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—আমরা কি শুধু বিহার নির্মাণ করছি, নাকি সেই বিহারে ধর্মের আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য শীলবান ও প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু তৈরির উদ্যোগও গ্রহণ করছি? আমরা কি শুধু দান ও উৎসবের আয়োজন করছি, নাকি শিশু-কিশোরদের মধ্যে বুদ্ধের শিক্ষা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মিত কাজ করছি? আমরা কি ভিক্ষু সংঘের কাছে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা করছি, নাকি তাঁদের অধ্যয়ন, গবেষণা, সাধনা ও ধর্মপ্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশও নিশ্চিত করছি? আমরা কি বিহারের নেতৃত্ব ও পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত, নাকি বিহারের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আন্তরিক?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের উপলব্ধি হবে যে, বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক সামর্থ্য, অবকাঠামোগত অগ্রগতি কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে ধর্মীয় জ্ঞান, শীলবিশুদ্ধতা, সংঘের ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার ওপর।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ, যেখানে ভিক্ষু সংঘকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হবে, তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা হবে, বিহারকে জ্ঞান ও সাধনার কেন্দ্রে পরিণত করা হবে এবং উপাসক-উপাসিকাদের ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা হবে।
বৌদ্ধ সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নটি শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংখ্যা কিংবা সামাজিক পরিচয় টিকিয়ে রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি মহান দর্শন, মানবিক সংস্কৃতি, নৈতিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় জ্ঞানভান্ডারের ধারাবাহিকতা। এই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য ভিক্ষু সংঘ, বিহার পরিচালনা কমিটি, উপাসক-উপাসিকা, তরুণ সমাজ, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ধর্মীয় সংগঠন—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
প্রতিটি বিহারে একজন যোগ্য ও বিনয়সম্পন্ন ভিক্ষুর নিয়মিত অবস্থানের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, ভিক্ষুদের জন্য ধর্মীয় অধ্যয়ন ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে, ত্রিপিটক ও পালি সাহিত্যের চর্চা সম্প্রসারণ করতে হবে এবং বিহারভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। পাশাপাশি বিহারের সম্পদ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, সংঘের মধ্যে ঐক্য এবং উপাসক-উপাসিকাদের মধ্যে ধর্মীয় দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করে কিংবা বর্তমানের আয়োজন নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগে ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে আজই পরিকল্পনা নিতে হবে, আজই যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে, আজই শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং আজই বিহার ও ভিক্ষু সংঘের মধ্যে একটি সুস্থ, সুন্দর ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গৌতম বুদ্ধের মহান দর্শন আমাদের শিখিয়েছে, বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, মানুষের অন্তরের পরিবর্তনই প্রকৃত ধর্মীয় উন্নয়নের পরিচয়। একটি বিহার নির্মাণের মাধ্যমে আমরা ধর্মের জন্য একটি স্থাপনা তৈরি করতে পারি, কিন্তু সেই বিহারে ধর্মের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন শীলবান, প্রজ্ঞাবান ও বিনয়সম্পন্ন ভিক্ষু সংঘ, নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা, সাধনা, ত্রিপিটক অধ্যয়ন এবং মানুষের মধ্যে মৈত্রী, করুণা ও প্রজ্ঞার বিকাশ। তাই বৌদ্ধ সমাজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিহার নির্মাণের পাশাপাশি সংঘের শিক্ষা, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গবেষণা ও নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় প্রশিক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আমরা যেন ভুলে না যাই, একটি বিহারের প্রকৃত সৌন্দর্য তার সোনার গম্বুজ, মার্বেল পাথর, দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার কিংবা বিশাল প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় সেখানে বসবাসরত ভিক্ষু সংঘের শীলবিশুদ্ধতা, বিনয়ানুশীলন, অধ্যয়ন, সাধনা, ধর্মদেশনা এবং উপাসক-উপাসিকাদের ধর্মনিষ্ঠ জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে। একজন শীলবান ভিক্ষু তাঁর জীবন দিয়ে ধর্মের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন, একজন প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু তাঁর জ্ঞান দিয়ে মানুষের অজ্ঞতা দূর করেন এবং একটি আদর্শ বিহার সেই জ্ঞান ও আদর্শকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।
আজ আমাদের আত্মসমালোচনা করার সময় এসেছে। আমরা কতগুলো বিহার নির্মাণ করেছি, কত টাকা ব্যয় করে মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছি, কত বড় আয়োজনের মাধ্যমে ধর্মীয় উৎসব সম্পন্ন করেছি—শুধু এই হিসাব দিয়ে বৌদ্ধ সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ করা যাবে না। বরং আমাদের হিসাব করতে হবে, কতজন শিশু বুদ্ধের শিক্ষা গ্রহণ করছে, কতজন তরুণ ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ হচ্ছে, কতজন ভিক্ষু ত্রিপিটক অধ্যয়ন ও সাধনায় নিয়োজিত রয়েছেন, কতটি বিহারে নিয়মিত ধর্মদেশনা হচ্ছে এবং আমাদের সমাজে শীল, প্রজ্ঞা, মৈত্রী ও করুণার চর্চা কতটুকু বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সুতরাং আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো—বিহারের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শীলবান ও প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু সংঘ গড়ে তোলা, বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধনার পরিবেশ নিশ্চিত করা, দানের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা সম্প্রসারণ করা এবং বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যোগ্য ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরি করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শীলহীনতা ধর্মীয় মর্যাদাকে দুর্বল করে, প্রজ্ঞাহীনতা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকে সীমিত করে, ধর্মচর্চাহীনতা বিহারের উদ্দেশ্যকে নিষ্প্রভ করে এবং সংঘের ধারাবাহিকতা দুর্বল হলে বৌদ্ধ সমাজের ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই ভিক্ষু সংঘকে মর্যাদা দিতে হবে তাঁদের শীল, বিনয়, জ্ঞান ও সাধনার ভিত্তিতে; বিহারকে সমৃদ্ধ করতে হবে ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এবং উপাসক-উপাসিকাদের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত করতে হবে।
অতএব, আসুন আমরা সবাই মিলে এমন একটি বৌদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি, যেখানে প্রতিটি বিহার হবে ধর্মীয় জ্ঞান ও সাধনার আলোকবর্তিকা, প্রতিটি ভিক্ষু হবেন শীল, বিনয় ও প্রজ্ঞার আদর্শিক অনুশীলনকারী, প্রতিটি উপাসক-উপাসিকা হবেন ধর্মের দায়িত্বশীল পৃষ্ঠপোষক এবং প্রতিটি নতুন প্রজন্ম হবে বুদ্ধের মহান আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরি।
শীলবান ভিক্ষু বিহারের মর্যাদা, প্রজ্ঞাবান ভিক্ষু ধর্মের আলোকবর্তিকা, আর জীবন্ত বিহার বৌদ্ধ সমাজের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান আশ্রয়।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। সকলের মঙ্গল হোক।
কলমে—
ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, পুরাতন চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম
অধ্যক্ষ গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারী