ধর্মের পরিহানির মূল কারণ: না জেনে, না বুঝে পণ্ডিত হওয়ার প্রবণতা
কলমে— ধর্মদূত স্থবির এম. ধর্মবোধি ভান্তে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ,
শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, পুরাতন চান্দগাঁও।
অধ্যক্ষ, গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারী। প্রকাশক ও সম্পাদক, জ্ঞান অন্বেষণ নিউজ
মানবজীবনের কল্যাণ, শুদ্ধি ও মুক্তির পথ হিসেবে ধর্মের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ধর্ম মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, চিন্তাকে সুস্থ করে এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ধর্মই অনেক সময় বিকৃত হয়ে পড়ে—তার মূল কারণ বাহ্যিক আঘাত নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়। বিশেষ করে, ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা না জেনে, না বুঝে নিজেকে পণ্ডিত বা জ্ঞানী মনে করার প্রবণতা ধর্মের পরিহানির অন্যতম প্রধান কারণ।
বৌদ্ধধর্মের মূল গ্রন্থসমূহে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। ধর্মকে সঠিকভাবে না বুঝে গ্রহণ করার বিপদ সম্পর্কে বহুবার সতর্ক করা হয়েছে। কারণ ধর্ম কেবল মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি উপলব্ধির বিষয়; কেবল শোনার বিষয় নয়, এটি অনুশীলনের বিষয়। যখন কেউ অল্প জ্ঞান নিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ জ্ঞানী মনে করে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের অহংকার জন্ম নেয়। এই অহংকারই তাকে প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
বুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ উপমা এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, ধর্মকে ভুলভাবে ধারণ করা যেন ভুলভাবে সাপ ধরার মতো—যার ফলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হয়। এই উপমার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, ধর্মের সঠিক উপলব্ধি না থাকলে তা মুক্তির পথ না হয়ে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আবার দেখা যায়, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। যখন কেউ শাস্ত্রের প্রকৃত অর্থ না বুঝে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে, তখন তা অন্যদের মধ্যেও ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে প্রকৃত ধর্ম ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যায় এবং বিকৃত রূপে প্রচারিত হতে থাকে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়।
ধর্মীয় গ্রন্থে অজ্ঞতার অহংকার সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। মূর্খ ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতাকেই জ্ঞান মনে করে—এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রথম শর্ত হলো নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করা। কিন্তু যখন কেউ নিজেকে পূর্ণ জ্ঞানী মনে করে, তখন তার শেখার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সে নিজে যেমন অন্ধকারে থাকে, তেমনি অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে।
বৌদ্ধ দর্শনে জ্ঞানের তিনটি স্তরের কথা বলা হয়েছে—শ্রবণ, চিন্তা এবং ভাবনা। প্রথমে শোনা বা পড়ার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়, তারপর তা যুক্তি দিয়ে যাচাই করা হয়, এবং সর্বশেষে অনুশীলনের মাধ্যমে তা উপলব্ধিতে রূপ নেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ প্রথম স্তরেই থেমে যায় এবং নিজেকে জ্ঞানী মনে করে। এখানেই মূল সমস্যা সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও ধর্মকে কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলাও একটি বড় সমস্যা। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও প্রজ্ঞার বিকাশ। কিন্তু যখন ধর্ম কেবল সামাজিক অনুষ্ঠান, কুসংস্কার বা বাহ্যিক আচারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়।
সংঘের মধ্যে বিভেদও ধর্মের পরিহানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যখন ব্যক্তি নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায়, ভিন্ন মতকে সহ্য করতে পারে না এবং দলাদলিতে লিপ্ত হয়, তখন ধর্মের ঐক্য নষ্ট হয়। এই বিভক্তি ধর্মকে দুর্বল করে এবং তার শক্তি ক্ষয় করে।
বর্তমান যুগে এই সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্ধজ্ঞান ও ভুল ব্যাখ্যার সহজ বিস্তার ধর্মকে আরও বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলছে। অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিজেদের মতামতকে ধর্ম হিসেবে প্রচার করছেন। এর ফলে ধর্মের প্রকৃত রূপ ক্রমেই আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিনয়, অধ্যয়ন এবং অনুশীলন। প্রথমত, আমাদের ‘আমি জানি’ এই অহংকার ত্যাগ করে ‘আমি শিখছি’ এই মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রামাণিক ধর্মগ্রন্থ ও আচার্যদের ব্যাখ্যার মাধ্যমে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তৃতীয়ত, সেই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ধর্মের পরিহানির মূল কারণ বাইরের কোনো শক্তি নয়; বরং মানুষের ভেতরের অজ্ঞতা ও অহংকার। যে ব্যক্তি না জেনে, না বুঝে নিজেকে পণ্ডিত মনে করে, সে নিজের অজান্তেই ধর্মের ক্ষতি করে। তাই ধর্মকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে নিজের মনকে শুদ্ধ করতে হবে, জ্ঞানকে পরিপূর্ণ করতে হবে এবং বিনয়ের সঙ্গে সত্যকে গ্রহণ করতে হবে।
ধর্ম তখনই টিকে থাকবে, যখন জ্ঞানের সঙ্গে বিনয়, অধ্যবসায় এবং অনুশীলন যুক্ত হবে। প্রকৃত ধর্মচর্চা তখনই সম্ভব, যখন আমরা সত্যকে জানার চেষ্টা করবো, বুঝবো এবং জীবনযাত্রায় তা প্রয়োগ করবো।