1. arkobd1@gmail.com : arkobd :
  2. dharmobodi88@gmail.com : স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে : স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে
  3. asyrvwvn@tacoblastmail.com : NARYTHY496NEHTYHYHTR :
  4. sumibaruasushmita@gmail.com : Sumi barua :
১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| বৃহস্পতিবার| রাত ১২:৫৮

পাপগ্রস্ত মানুষের দুঃখ ও মৃত্যুমুখে পতন:

ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভিক্ষু
  • প্রকাশিত হয়েছেঃ বুধবার, জুন ১০, ২০২৬,
  • 79 বার দেখা হয়েছে

পাপগ্রস্ত মানুষের দুঃখ ও মৃত্যুমুখে পতন:


কলমে-  ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে


প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, পুরাতন চান্দগাঁও।

অধ্যক্ষ, গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারী


মানবজীবন এক অনিত্য প্রবাহ, যেখানে প্রতিটি চিন্তা, বাক্য ও কর্ম ভবিষ্যতের ফল নির্ধারণ করে। বুদ্ধধর্মে “পাপগ্রস্ত মানুষ” বলতে বোঝানো হয় সেই ব্যক্তিকে, যার চিত্ত লোভ (রাগ), দ্বেষ (দোষ) এবং মোহ (অজ্ঞতা) দ্বারা কলুষিত; যে ব্যক্তি এই ত্রিবিধ চিত্ত দ্বরা প্রভাবিত হয়ে অকুশল কর্মে লিপ্ত হয়।

ত্রিপিটকের বিভিন্ন সুত্তে বুদ্ধ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন—কীভাবে এই পাপাচার মানুষের অন্তরে দুঃখের বীজ বপন করে এবং ক্রমশ তাকে মৃত্যুর দিকে, এমনকি দুঃখময় পুনর্জন্মের দিকে ধাবিত করে।

প্রথমত, দুঃখের সূচনা ঘটে চিত্তে। ধম্মপদের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোকে (Dhammapada 1–2) বলা হয়েছে—

মনোপুব্বঙ্গমা ধম্মা, মনোসেত্থা মনোময়া…”

অর্থাৎ, সকল ধর্ম (অভিজ্ঞতা) মনের দ্বারা পরিচালিত, মনই প্রধান। যদি কেউ দুষ্ট চিত্তে কথা বলে বা কাজ করে, দুঃখ তাকে অনুসরণ করে ঠিক যেমন গরুর পেছনে গাড়ির চাকা চলে।

এই বাণী আমাদের স্পষ্ট করে দেয়—পাপের মূল বাহ্যিক কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি অন্তরের বিকৃতি। পাপগ্রস্ত মানুষ প্রথমেই নিজের মনকে কলুষিত করে এবং সেই কলুষিত মন থেকেই জন্ম নেয় দুঃখের অনিবার্য প্রবাহ।

এই চিত্তদূষণের ফল তাৎক্ষণিকভাবেই অনুভূত হয়। ধম্মপদ (শ্লোক ১৭)-এ বলা হয়েছে—

ইধ সোচতি পেচ্চ সোচতি, পাপকারী উভয়ত্থ সোচতি…”

অর্থাৎ, পাপকর্মকারী ব্যক্তি এই জীবনেও দুঃখ পায়, পরজীবনেও দুঃখ পায়; সে উভয় অবস্থাতেই কষ্ট ভোগ করে। এখানে বুদ্ধ একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য তুলে ধরেছেন—পাপ কেবল বাহ্যিক শাস্তির বিষয় নয়, বরং এটি অন্তর্দহন, অনুতাপ (কুক্কুচ্চ), ভয় এবং অস্থিরতার মাধ্যমে মানুষকে প্রতিনিয়ত জ্বালায়। পাপগ্রস্ত ব্যক্তি হয়তো বাহ্যিকভাবে সুখী মনে হতে পারে, কিন্তু তার অন্তর থাকে উদ্বেগে, অপরাধবোধে এবং এক অদৃশ্য যন্ত্রণায় দগ্ধ।

এরপর আসে দুঃখের চক্র, যা বুদ্ধ সংযুক্ত নিকায়ের প্রতীত্যসমুৎপাদ সূত্রে (SN 12.1 – Paṭiccasamuppāda Sutta) ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে বলা হয়েছে—

অজ্ঞা (অবিদ্যা) থেকে সংস্কার, সংস্কার থেকে বিজ্ঞান, বিজ্ঞান থেকে নাম-রূপ, নাম-রূপ থেকে ষড়ায়তন, ষড়ায়তন থেকে স্পর্শ, স্পর্শ থেকে বেদনা, বেদনা থেকে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা থেকে উপাদান, উপাদান থেকে ভব, ভব থেকে জাতি, এবং জাতি থেকে জরা-মরণ।

এই সূত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, পাপগ্রস্ত মানুষ মূলত অজ্ঞতার দ্বারা আবদ্ধ থাকে এবং তৃষ্ণা ও আসক্তির দ্বারা চালিত হয়ে ক্রমাগত নতুন কর্ম (সংস্কার) সৃষ্টি করে। এই কর্মই তাকে পুনরায় জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ রাখে। অর্থাৎ, পাপ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা দুঃখের পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

মানুষের কর্মফল কীভাবে তার জীবন ও মৃত্যুকে প্রভাবিত করে, তা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে মজ্ঝিম নিকায়ের চূলকাম্মবিভঙ্গ সুত্তে (MN 135 – Cūḷakammavibhaṅga Sutta)। এখানে বুদ্ধ বলেছেন—

যে প্রাণী হত্যা করে, সে স্বল্পায়ু হয়;

যে অন্যকে কষ্ট দেয়, সে নিজেও কষ্ট ভোগ করে;

যে দয়ালু, সে সুখ ও দীর্ঘায়ু লাভ করে।

এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, পাপগ্রস্ত মানুষের জীবন নিজেই তার কর্মের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, মৃত্যুকালেও এই কর্মের প্রভাব গভীরভাবে কার্যকর হয়। মৃত্যুর সময় পূর্বকৃত কর্মের স্মৃতি চিত্তে উদয় হয়, এবং সেই চিত্তের অবস্থা পরবর্তী জন্ম নির্ধারণ করে। পাপাচারী ব্যক্তির চিত্ত তখন ভীত, অস্থির এবং অনুতাপে পূর্ণ থাকে—যা তাকে শান্ত মৃত্যুর পরিবর্তে যন্ত্রণাময় অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।

এই প্রসঙ্গে দেবদূত সুত্ত (MN 130 – Devadūta Sutta) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে বুদ্ধ বর্ণনা করেছেন যে, মানুষ জীবনে তিনটি “দেবদূত”—বার্ধক্য, রোগ এবং মৃত্যু—দেখেও সতর্ক হয় না। যারা এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে পাপে লিপ্ত থাকে, তারা মৃত্যুর পর ভয়ংকর দুঃখ ভোগ করে। এই সুত্তে নরকের যন্ত্রণার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একটি নৈতিক সতর্কতা—পাপের পরিণতি অবশ্যম্ভাবী এবং তা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

অন্যদিকে, সংযুক্ত নিকায়ের সাল্ল সুত্তে (SN 36.6 – Sallatha Sutta) বুদ্ধ বলেছেন, সাধারণ মানুষ দুঃখে দুইবার বিদ্ধ হয়—প্রথমত শারীরিকভাবে, দ্বিতীয়ত মানসিকভাবে। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল একবারই দুঃখ অনুভব করে। পাপগ্রস্ত মানুষ যেহেতু অশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত চিত্তের অধিকারী, তাই সে প্রতিটি দুঃখকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে। তার অনুতাপ, ভয়, হতাশা—সব মিলিয়ে তার দুঃখ বহুগুণে তীব্র হয়ে ওঠে।

পরিশেষে, পাপের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে অঙ্গুত্তর নিকায়ে (AN 3.36)—অকুশল কর্ম মানুষকে অপায় গতিতে নিয়ে যায়, যেমন নরক (নিরয়), প্রেতলোক বা পশুজন্ম। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়; বরং এটি কর্মফলের একটি নৈতিক ব্যাখ্যা, যা বোঝায়—পাপের ফল দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর দুঃখময়।

এই সমস্ত সুত্তের আলোকে আমরা একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা দেখতে পাই—

অজ্ঞতা (মোহ) থেকে তৃষ্ণা (লোভ), তৃষ্ণা থেকে পাপকর্ম, পাপকর্ম থেকে মানসিক দহন, সেখান থেকে দুঃখময় জীবন, তারপর অশান্ত মৃত্যু, এবং অবশেষে দুঃখময় পুনর্জন্ম। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি অবিচ্ছিন্ন কার্যকারণ সম্পর্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

অতএব, বুদ্ধের শিক্ষা আমাদের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা—পাপ কোনো বাহ্যিক শাস্তির কারণ নয়, বরং এটি নিজের মধ্যেই দুঃখের আগুন বহন করে। এই আগুন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো শীল (নৈতিকতা), সমাধি (ধ্যান) এবং প্রজ্ঞা (জ্ঞান) চর্চা করা।

ধম্মপদের অমর বাণীতে এই পথ সংক্ষেপে বলা হয়েছে—

“সব পাপ থেকে বিরত হও, কুশল সাধন করো, নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করো—এটাই বুদ্ধদের শিক্ষা।”

এই বাণীই আমাদের দেখায়—যে মানুষ পাপ থেকে বিরত হয়ে মনকে শুদ্ধ করে, সে-ই প্রকৃতপক্ষে দুঃখ থেকে মুক্তি পায় এবং শান্ত মৃত্যুর মাধ্যমে নির্বাণপথে অগ্রসর হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এ জাতীয় আরো খবর..

আজকের দিন-তারিখ

  • বৃহস্পতিবার (রাত ১২:৫৮)
  • ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল)

জ্ঞানঅন্বেষণ © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।