ঐতিহ্যবাহী পুণ্যতীর্থ গুমানমর্দন শান্তি বিহার-
ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মচর্চা ও মানবকল্যাণের এক অনন্য পুণ্যভূমি
কলমে— ধর্মদূত স্থবির এম. ধর্মবোধি ভান্তে
ভূমিকা
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার হালদা নদীবিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গুমানমর্দন একটি প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবময় জনপদ। সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, নদীর স্নিগ্ধ প্রবাহ, উর্বর ভূমি, গ্রামীণ মানুষের সহজ-সরল জীবনধারা এবং বহু প্রজন্মের স্মৃতি ও ঐতিহ্য এই জনপদকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়। গুমানমর্দনের ভৌগোলিক পরিচয়ের সঙ্গে যেমন হালদা নদীর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে বৌদ্ধ ধর্ম, বিহার, ধর্মীয় আচার, শিক্ষা, মানবিকতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য। স্থানীয় সরকারি ইতিহাসেও গুমানমর্দনকে ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এ অঞ্চলে প্রাচীন বৌদ্ধ বসতির স্মৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল স্মারক হলো গুমানমর্দন শান্তি বিহার। একটি ক্ষুদ্র কুঁড়েঘর সদৃশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজকের বৃহত্তর ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে, তার ইতিহাস কেবল একটি বিহারের ইতিহাস নয়; বরং এটি বহু প্রজন্মের দান, ত্যাগ, শ্রম, সাধনা, ধর্মবিশ্বাস, ভালোবাসা ও আত্মনিবেদনের সম্মিলিত ইতিহাস।
গুমানমর্দন শান্তি বিহার দীর্ঘকাল ধরে বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অসংখ্য মানুষের পুণ্যচর্চার কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে এসেছে। এখানে মানুষ দান করেছে, শীল পালন করেছে, ধর্মশ্রবণ করেছে, ভাবনায় বসেছে, ভিক্ষু সংঘকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে এবং নিজের জীবনকে ধর্মের আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করেছে। ফলে এই বিহার শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি মানুষের বিশ্বাস, অনুভূতি, পুণ্যস্মৃতি ও আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের একটি জীবন্ত প্রতীক।
গুমানমর্দন—কীর্তিমান মানুষ ও ঐতিহ্যের জনপদ
কোনো জনপদের ইতিহাস কেবল তার মাটি, নদী, বৃক্ষ কিংবা স্থাপনার ইতিহাস নয়; সেই জনপদের প্রকৃত পরিচয় বহন করেন তার মানুষ। যে মাটিতে জ্ঞানী, গুণী, সমাজহিতৈষী ও মানবপ্রেমী মানুষের জন্ম হয়, সেই মাটির ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে তাঁদের কর্ম ও কীর্তির মধ্য দিয়ে।
গুমানমর্দন এমনই এক গৌরবময় জনপদ। এ গ্রামের কৃতী সন্তানদের মধ্যে ডাঃ রাজেন্দ্র লাল মুৎসুদ্দী, শ্যাম বড়ুয়া, যোগেন্দ্র নাথ মুৎসুদ্দী, ডাঃ যতীন্দ্র লাল বড়ুয়া, ডাঃ সুধাংশু বিমল বড়ুয়া, মাস্টার অনন্ত মুৎসুদ্দী, হৃদয় কুমার চৌধুরী, মাস্টার নেপাল মুৎসুদ্দী, মাস্টার মৃদুল বড়ুয়া, উথামা মুৎসুদ্দী (লক্ষ্মী) এবং ডাঃ ব্রজকিশোর বড়ুয়া প্রমুখের নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।
তাঁদের কেউ জ্ঞানচর্চায়, কেউ চিকিৎসাসেবায়, কেউ শিক্ষাক্ষেত্রে, কেউ সমাজকল্যাণে, কেউ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এবং কেউ মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের কর্ম ও অবদান গুমানমর্দনের সামাজিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সামনে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এই কৃতী মানুষদের জীবন ও কর্মের সঙ্গে গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাসও কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। কারণ একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কোনো একক ব্যক্তির হাতে গড়ে ওঠে না; বহু মানুষের সম্মিলিত শ্রম, মেধা, অর্থ, ভূমি, সময় ও ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়েই একটি বিহার যুগের পর যুগ টিকে থাকে।
আর্য বিহার থেকে শান্তি বিহার—এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিযাত্রা-
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে আমরা ফিরে যাই প্রায় দুই শতাব্দীরও অধিককাল পেছনে। প্রাপ্ত ঐতিহ্যগত তথ্য অনুসারে, আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে নান্যা ও কান্যা নামের দুই ভাইয়ের সহযোগিতায় বর্তমান বিহারের উত্তর-পূর্ব কোণে, বর্তমানে ক্যাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষের স্থানে, একটি ছোট কুঁড়েঘর সদৃশ বিহার নির্মিত হয়েছিল।
সেই ক্ষুদ্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘আর্য বিহার’।
আজকের দৃষ্টিতে হয়তো একটি কুঁড়েঘরকে খুব সাধারণ স্থাপনা বলে মনে হতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের বিচারে তার মূল্য ছিল অপরিসীম। কারণ একটি ছোট ঘর কখনো কখনো একটি বৃহৎ ধর্মীয় আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে উঠতে পারে। আর্য বিহারও ছিল তেমনই এক প্রাথমিক আশ্রয়, যেখানে বুদ্ধের বাণী উচ্চারিত হয়েছে, ধর্মের কথা আলোচনা হয়েছে, ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে মানুষ পুণ্যসঞ্চয়ের সুযোগ পেয়েছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে।
পরবর্তীকালে শ্রীমৎ দুরাজ ঠাকুর এ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আনুমানিক ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে পূর্বপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী বিহারটি একই স্থানে পুনঃসংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নতুন পরিচয় লাভ করে এবং ধীরে ধীরে গুমানমর্দন শান্তি বিহার নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
একটি ছোট কুঁড়েঘর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা ছিল মূলত ধর্মীয় চেতনার যাত্রা। স্থাপনা পরিবর্তিত হয়েছে, ভবন পরিবর্তিত হয়েছে, প্রজন্ম পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু বুদ্ধের বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধর্মচর্চার আকাঙ্ক্ষা কখনো বিলীন হয়নি।
দানশীল মানুষের হাত ধরে বিহারের বিকাশ-
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাসে দানশীলতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধধর্মে দান কেবল সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার নাম নয়; দান হলো চিত্তের উদারতা, ত্যাগের মানসিকতা এবং অন্যের কল্যাণে নিজের সামর্থ্য উৎসর্গ করার এক মহৎ অনুশীলন।
এই আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে শান্তি বিহারের ইতিহাসে।
বালুখালী নিবাসী দানশীল ব্যক্তিত্ব ঝুঁইচান বলী নিজ অর্থে কাঠ ও টিন দিয়ে একটি সুন্দর বিহার নির্মাণ করেন। তিনি বিহারের জন্য প্রায় ৮ শতাংশ জমিও দান করেন। তাঁর এই দান কেবল একটি স্থাপনা নির্মাণে সহায়তা করেনি; বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার পথ তৈরি করেছে।
এই ধরনের দানশীল মানুষের কারণে বিহার কখনো কেবল ইট-কাঠের স্থাপনা হয়ে থাকেহ না; মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও পুণ্যচেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা হয়ে ওঠে একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।
বিহারভূমি ও পূর্বপুরুষদের অমর দান-
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ভিটা ও সম্পত্তি গঠনের ইতিহাসে স্থানীয় মুৎসুদ্দী পরিবার এবং অন্যান্য দানশীল ব্যক্তির অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বিহারভিটার মালিকানা মুৎসুদ্দী পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরবর্তীকালে পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে বিহারের জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন—ডাঃ রাজেন্দ্র লাল মুৎসুদ্দী, প্রয়াত অনন্ত মুৎসুদ্দী, প্রয়াত যামিনী রঞ্জন মুৎসুদ্দী, প্রয়াত সুরেন্দ্র লাল বড়ুয়া এবং প্রয়াত হৃদয় চৌধুরী।
এই নামগুলো শুধু জমির কাগজে লেখা কয়েকটি নাম নয়; এগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আত্মত্যাগের স্মারক।
পরবর্তীকালে যামিনী মুৎসুদ্দীর পুত্র বাবু উদয়ান মুৎসুদ্দী তাঁর পিতার জমি থেকে ১৪ শতক জায়গা বিহারের নামে লিখে দেন। তাঁর এই দান বিহারের সম্পত্তি সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
কাঠগড়ের বাবু রাম মহাজনের অবদানও এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তিনি বর্তমান বিহারের ভিটা ক্রয় করে প্রায় ৪৭ শতাংশ জমি ক্যাং-এর নামে শ্রীমৎ দুরাজ ঠাকুরকে দান করেন। মহিমা ঠাকুর দান করেন ১ কানি ১৩ গণ্ডা জমি। মহারাজ কবলা করেন ৬ গণ্ডা জমি। যোগেন্দ্র নাথ মুৎসুদ্দী এবং ডাঃ সুধাংশু বিমল বড়ুয়াও ৬ গণ্ডা করে জমি দান করেন।
এইসব দানের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ধর্ম ও সমাজের কল্যাণের চিন্তা। তাঁদের কেউ হয়তো ভাবেননি যে বহু দশক বা শতাব্দী পর তাঁদের নাম স্মরণ করা হবে; কিন্তু তাঁদের দান আজও বিহারের ইতিহাসে আলো ছড়াচ্ছে।
তাঁদের দান আমাদের শেখায়—একটি মহৎ প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি কখনো কেবল অর্থ দিয়ে তৈরি হয় না; এর সঙ্গে প্রয়োজন ত্যাগ, বিশ্বাস, উদারতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধ।
বৃহত্তর জনপদের ধর্মীয় মিলনকেন্দ্র-
একসময় গুমানমর্দন গ্রামে এটিই ছিল একমাত্র বৌদ্ধ বিহার। ফলে গুমানমর্দনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রুদ্রপুর, বালুখালী, উত্তরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার উপাসক-উপাসিকাগণ এখানে নিয়মিত সমবেত হতেন।
ধর্মীয় উৎসব, উপোসথ, পূজা, সংঘদান, ধর্মশ্রবণ, বুদ্ধবন্দনা কিংবা অন্যান্য পুণ্যকর্ম উপলক্ষে বিহারপ্রাঙ্গণে মানুষের সমাগম ঘটত। বয়োজ্যেষ্ঠদের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্মও ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেত।
এভাবেই বিহার হয়ে উঠেছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবারের মিলনক্ষেত্র।
মানুষ এখানে এসে শুধু পূজা করত না; পরস্পরের সঙ্গে দেখা করত, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করত এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা অর্জন করত।
বুদ্ধের শিক্ষা ছিল মৈত্রী, করুণা, অহিংসা ও প্রজ্ঞার শিক্ষা। শান্তি বিহারের ধর্মীয় পরিবেশ সেই শিক্ষাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
মুৎসুদ্দী পরিবারের উল্লেখযোগ্য সম্পত্তির ওপর ভিত্তি করে বিহারের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ ঘটেছিল বলে সাধারণ মানুষের মুখে এটি দীর্ঘদিন ‘মুৎসুদ্দীর ক্যাং’ নামেও পরিচিত ছিল। এই নামের মধ্যেও নিহিত ছিল বিহারের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও আবেগ।
দুর্যোগের আঘাত ও পুনর্গঠনের ইতিহাস-
ইতিহাস কখনো সরলরেখায় এগোয় না। সময়ের সঙ্গে আসে দুর্যোগ, বিপর্যয়, ধ্বংস ও পুনর্গঠনের অধ্যায়। গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাসেও এমন কঠিন সময় এসেছে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ডাঃ সুধাংশু বিমল বড়ুয়া, যোগেন্দ্র নাথ মুৎসুদ্দী এবং এলাকার অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তির সহযোগিতায় বিহারের জন্য নতুন ক্যাংভিটা প্রস্তুত করা হয়েছিল।
কিন্তু ১৯৬০ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সেই উদ্যোগকে কঠিন আঘাত করে। এলাকার স্কুল ও ক্যাং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিধ্বস্ত হয়। বিহার ও বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সাময়িকভাবে শ্যাম বাবুর গৃহে স্থানান্তর করা হয়।
একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষের ধর্মবিশ্বাস ধ্বংস হয়নি। বরং বিপদের মধ্যেও মানুষ বিহারের কার্যক্রম ধরে রেখেছিল। এটিই একটি জীবন্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শক্তি—ভবন ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া যায় না।
১৯৬১—নতুন পাকা বিহারের সূচনা-
১৯৬১ সালে বাবু যতীন্দ্র মোহন বড়ুয়া বার্মা থেকে দেশে ফিরে গুমানমর্দন ক্যাং-এর শোচনীয় অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বিহারের দুরবস্থা উপলব্ধি করে নিজ অর্থায়নে এবং স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতায় নতুন পাকা বিহার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তাঁর এই উদ্যোগ ছিল শুধু একটি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নয়; বরং এটি ছিল একটি ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রয়াস।
দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা, মানুষের ধর্মীয় আবেগ এবং সম্মিলিত সহযোগিতা একত্রিত হয়ে অবশেষে বাস্তব রূপ লাভ করে। নির্মিত হয় নতুন পাকা বিহার।
এই নতুন বিহার নির্মাণের মাধ্যমে শান্তি বিহারের ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। পুরোনো ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুন স্থাপত্য, নতুন পরিবেশ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহার
স্থাপত্য, বোধিবৃক্ষ ও পবিত্র পরিবেশ-
নতুন বিহারের স্থাপত্য পরিকল্পনাও ছিল তৎকালীন সময়ের বিবেচনায় যথেষ্ট আকর্ষণীয়। তিন দিক বারান্দাবেষ্টিত বিহারের মধ্যভাগে ছিল প্রশস্ত হলঘর এবং বুদ্ধমূর্তি স্থাপনের জন্য পৃথক কক্ষ। বারান্দার দুই পাশে ভিক্ষু ও শ্রামণদের অবস্থানের জন্য পৃথক কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল।
বিহারের স্থাপত্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের সমন্বয় এ স্থানটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষ করে বিহারপ্রাঙ্গণের বোধিবৃক্ষ এ পুণ্যভূমির আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে আরও গভীর করেছে। বুদ্ধগয়ার পবিত্র বোধিবৃক্ষের পাদমূল থেকে সংগৃহীত বোধিচারা এখানে রোপণ করা হয়। শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপাল মহাথের মহোদয় এ বোধিচারা দান করেন।
আজ সেই বোধিবৃক্ষ শুধু একটি বৃক্ষ নয়; এটি স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও বুদ্ধের বোধিজ্ঞান লাভের ঐতিহাসিক স্মরণের প্রতীক। এর ছায়ায় বসে মানুষ ধ্যান করে, ধর্মের কথা স্মরণ করে, জীবনের অনিত্যতা উপলব্ধি করে এবং নিজের অন্তরকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
বোধিবৃক্ষ, বিহারের নীরবতা, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ধর্মীয় আবহ একত্রিত হয়ে গুমানমর্দন শান্তি বিহারকে একটি প্রশান্ত পুণ্যভূমিতে পরিণত করেছে।
একটি বিহারের প্রকৃত প্রাণ তার ধর্মীয় পরিবেশ, আর সেই পরিবেশের অন্যতম প্রধান রক্ষক ও নির্মাতা হলেন বিহারাধ্যক্ষ। গুমানমর্দন শান্তি বিহারের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ, সাধনাশীল ও ধর্মপরায়ণ ভিক্ষু-মহাথের বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দায়িত্ব পালনকারী বিহারাধ্যক্ষদের ধারাবাহিক তালিকা হলো—
১. শ্রীমৎ দুরাজ ঠাকুর ২. শ্রীমৎ মহিমা ঠাকুর ৩. শ্রীমৎ ষষ্ঠি ঠাকুর ৪. শ্রীমৎ পুলিন ঠাকুর ৫. ভদন্ত জ্যোতিঃপাল মহাথের ৬. ভদন্ত বিনয়জ্যোতি ভিক্ষু ৭. ভদন্ত শান্তরক্ষিত মহাথের ৮. ভদন্ত বিপুলসেন ভিক্ষু ৯. ভদন্ত যোগানন্দ ভিক্ষু ১০. ভদন্ত বিমলানন্দ ভিক্ষু ১১. ভদন্ত বোধিপাল ভিক্ষু ১২. ভদন্ত বুদ্ধপ্রিয় ভিক্ষু ১৩. ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথের ১৪. ভদন্ত ধর্মানন্দ ভিক্ষু ১৫. ভদন্ত আর্যামিত্র ভিক্ষু ১৬. ভদন্ত বিনয়শ্রী ভিক্ষু ১৭. ভদন্ত সাধনানন্দ থের ১৮. ভদন্ত বোধিশ্রী ভিক্ষু ১৯. ভদন্ত জিনপ্রিয় ভিক্ষু ২০. স্থবির এম. ধর্মবোধি ভান্তে মহোদয় যিনি বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন।
এই দীর্ঘ তালিকা একটি বিষয়ই প্রমাণ করে—গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ধর্মীয় ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়নি। এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম, এক অধ্যক্ষের পর আরেক অধ্যক্ষ ধর্মীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তাঁদের সাধনা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে গেছে।
ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথের—দীর্ঘ সাধনা ও নেতৃত্বের এক অধ্যায়–
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাসে ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথেরের নাম বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
১৯৬৭ সালের এক শুভলগ্ন থেকে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি এ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় কয়েক দশকের এই দীর্ঘ সময় ছিল বিহারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাঁর নেতৃত্বে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, অসংখ্য মানুষ ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেছেন এবং বহু প্রজন্ম বিহারের আধ্যাত্মিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
একজন বিহারাধ্যক্ষের প্রকৃত অবদান শুধু তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তিনি কত মানুষের অন্তরে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জাগাতে পেরেছেন, কত মানুষকে নৈতিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করেছেন এবং কতটা স্থায়ী ঐতিহ্য রেখে যেতে পেরেছেন—তার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথেরের দীর্ঘ দায়িত্বকাল গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
বিহার—শুধু উপাসনার স্থান নয়, আত্মশুদ্ধির শিক্ষাকেন্দ্র
বৌদ্ধ দর্শনে বিহারের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বিহার কেবল ভিক্ষুদের আবাসস্থল নয়; এটি ধর্মশ্রবণ, শীলচর্চা, ভাবনা, প্রজ্ঞার বিকাশ, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক জীবন গঠনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
ভগবান বুদ্ধ মানুষের মুক্তির জন্য যে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ প্রদর্শন করেছেন, তার বাস্তব অনুশীলনের পরিবেশ তৈরিতে বিহারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বুদ্ধের ধর্মের পরম লক্ষ্য নির্বাণ। তাই একটি আদর্শ বিহারের কাজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করা নয়; বরং মানুষকে নিজের মনকে চিনতে, লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করতে এবং মৈত্রী-করুণা-প্রজ্ঞায় জীবনকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করা।
বুদ্ধবাণীতে বলা হয়েছে—
“নির্বাণং পরমং সুখং।”
অর্থাৎ নির্বাণই পরম সুখ।
এই মহান সত্যকে সামনে রেখে গুমানমর্দন শান্তি বিহার দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ধর্ম, নৈতিকতা, সংযম ও প্রজ্ঞার পথে চলার অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছে।
বিহারের মূল দর্শনকে একটি বাক্যে প্রকাশ করা যায়—
“জীবনের জন্য ধর্ম; ধর্মের জন্য জীবন নয়।”
ধর্ম মানুষের জীবনকে সুন্দর করবে, মানবিক করবে, নৈতিক করবে এবং শান্তিময় করবে—এটাই ধর্মচর্চার প্রকৃত উদ্দেশ্য। ধর্ম যদি মানুষের আচরণে মৈত্রী, করুণা, সত্যনিষ্ঠা ও নৈতিকতা সৃষ্টি করতে না পারে, তবে ধর্মীয় আচরণ কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই কারণে গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ধর্মচর্চার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত—মানুষের অন্তরে ধর্মের আলো জ্বালানো এবং সেই আলো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।
নতুন বিহার নির্মাণ—ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যতের সংযোগ
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো বিহারটি বৃহত্তর ধর্মীয় কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই একটি বৃহত্তর, আধুনিক ও সুপরিকল্পিত বিহার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
এই প্রয়োজন থেকেই গুমানমর্দন শান্তি বিহারের দায়ক-দায়িকা, পরিচালনা কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নতুন বিহার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
প্রয়াত ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথের মহোদয়ের আশ্রম নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানে নতুন বিহার নির্মাণের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাবু মাখন মুৎসুদ্দী ও বাবু উদয়ান মুৎসুদ্দীকে ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথেরের নিকট থেকে স্ট্যাম্পে প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তাঁরা ২৫ মার্চ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে যথাযথ অনুমতি গ্রহণ করেন।
এরপর নির্ধারিত জমিতে নতুন বিহার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দুই দাগে সর্বমোট ৪৬৬০ নং খতিয়ানের বিএস ১৫৪৮৮ দাগে ১২ শতাংশ এবং ৪৬৬১ নং খতিয়ানের ১৫৪৮৬ ও ১৬৩০২৪ দাগের পূর্ব আইল মোজা ৪ গণ্ডা ১ কড়া—সর্বমোট ১০ গণ্ডা ১ কড়া জমির ওপর নতুন বিহার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
নতুন বিহারের নকশা ও প্রাক্কলন প্রস্তুতের জন্য Ar. Bijoy Talukder Associates, 7th Floor, Karnafully Tower, 63 S.S. Khaled Road-এর Design & Estimate গ্রহণ করা হয়। আলোচনা, পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে নকশা ও প্রাক্কলন অনুমোদন করা হয়।
নির্মাণকাজ—একটি ভবনের চেয়েও বড় স্বপ্ন-
১ জুন ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে যথানিয়মে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে নতুন বিহারের নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি টাকা।
মোট ৪১টি পিলারের মধ্যে ৩৭টি পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম তলার ফ্লোর ও ছাদ ঢালাইয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ লক্ষ টাকার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
তবে এই নির্মাণকাজের গুরুত্ব কেবল অর্থমূল্য দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
কারণ এই ভবনের প্রতিটি ইটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, প্রতিটি পিলারের সঙ্গে রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশা, প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে রয়েছে ধর্মচর্চার স্বপ্ন এবং প্রতিটি নির্মাণধাপের সঙ্গে রয়েছে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় করার আকাঙ্ক্ষা।
একটি ভবন নির্মিত হবে—এটি প্রকল্পের বাহ্যিক দিক; কিন্তু প্রকৃত লক্ষ্য হলো এমন একটি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ করা, যেখানে আগামী প্রজন্ম বুদ্ধের বাণী শুনবে, ধর্মের শিক্ষা গ্রহণ করবে, শীল পালন করবে, ভাবনা করবে এবং মানবিক মূল্যবোধে জীবন গড়ে তুলবে।
ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে’র আগমন-
এই গ্রামের কল্যাণ ও মানুষের সার্বিক উন্নতির চিন্তায় যাঁদের প্রাণ প্রতিনিয়ত ব্যাকুল থাকে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন সমাজহিতৈষী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব বাবু সুমিত বড়ুয়া উজ্জল।
গ্রামের মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ দীর্ঘদিনের। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আন্তরিক উদ্যোগ এবং গ্রামের মানুষের সম্মিলিত আগ্রহ ও প্রত্যাশার পরিপ্রেক্ষিতে পরমপূজ্য ত্রিপিটক বিশারদ ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তেকে গুমানমর্দ্দন শান্তি বিহারের বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে বরণ করে নেওয়া হয়।
এটি শুধু একজন ভান্তেকে বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে বরণ করার ঘটনা নয়; বরং গ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই মহৎ উদ্যোগের পেছনে বাবু সুমিত বড়ুয়া উজ্জলের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর মতো সমাজহিতৈষী মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী উদ্যোগই একটি গ্রামের ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ ও আলোকিত করে তুলতে পারে।
২০২৪—নবজাগরণের নতুন অধ্যায়-
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাসে ২০২৪ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল, শুক্রবার বর্তমান বিহারাধ্যক্ষ স্থবির এম. ধর্মবোধি ভান্তে গুমানমর্দন শান্তি বিহারে আগমন করে বিহারাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর শুধু ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং বিহারের সামগ্রিক উন্নয়ন, ধর্মীয় পরিবেশের সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা, ধর্ম ও বিনয়চর্চার পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
গ্রামবাসী, দায়ক-দায়িকা, পরিচালনা কমিটি এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতায় বিহারের ধর্মীয় পরিবেশে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।
বিহারের নিচতলায় ধর্ম ও বিনয়চর্চার জন্য একটি সুন্দর ও শান্ত পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। নিয়মিত ধর্মশ্রবণ, প্রার্থনা, ভাবনা, নৈতিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকে।
বর্তমানে শান্তি বিহারে দুইজন ভিক্ষু ও দুইজন শ্রামণ ও সেবক অবস্থান করছেন। তাঁদের অধ্যয়ন, বিনয়চর্চা ও ধর্মসাধনা বিহারের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
ঐতিহ্য থেকে নবজাগরণ—এক অবিচ্ছিন্ন সেতুবন্ধন
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি কখনো তার অতীতকে অস্বীকার করেনি এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনকেও উপেক্ষা করেনি।
আর্য বিহারের ক্ষুদ্র কুঁড়েঘর থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ বৃহৎ বিহার নির্মাণের স্বপ্নে পৌঁছেছে। এর মাঝখানে রয়েছে বহু প্রজন্মের মানুষের ত্যাগ, অসংখ্য দাতার দান, বহু ভিক্ষু-মহাথেরের ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং অসংখ্য উপাসক-উপাসিকার ভালোবাসা।
এটি একটি ধারাবাহিকতা—
অতীত থেকে বর্তমান,
বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ;
পূর্বপুরুষের দান থেকে উত্তরসূরির দায়িত্ব;
ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে আধুনিক ধর্মচর্চা;
এবং ব্যক্তিগত পুণ্য থেকে সামাজিক কল্যাণের পথে এক দীর্ঘ অভিযাত্রা।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
একটি বিহারের ভবিষ্যৎ কেবল তার ভবনের আকারের ওপর নির্ভর করে না; তার প্রকৃত ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ধর্মীয় আদর্শ, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, যোগ্য ধর্মীয় নেতৃত্ব, উপাসক-উপাসিকাদের ঐক্য এবং নতুন প্রজন্মকে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর।
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ভবিষ্যৎও তাই একটি বৃহৎ সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
ভবিষ্যতে এই বিহার ধর্মীয় শিক্ষা, ত্রিপিটক অধ্যয়ন, ধর্মশ্রবণ, ধ্যান-ভাবনা, নৈতিক শিক্ষা, শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় প্রশিক্ষণ এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের আরও শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বিহারের নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি যদি এখানে একটি সমৃদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থাগার, নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনা, ত্রিপিটক শিক্ষা, ধ্যানচর্চা, শ্রামণ-ভিক্ষুদের অধ্যয়ন এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম গড়ে ওঠে, তবে গুমানমর্দন শান্তি বিহার শুধু স্থানীয় নয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচয় লাভ করতে পারে।
পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব
আজ আমরা যে বিহারের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করি, তার পেছনে রয়েছেন এমন বহু মানুষ, যাঁদের অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসের বড় বইয়ে লেখা নেই। তাঁরা কেউ জমি দিয়েছেন, কেউ অর্থ দিয়েছেন, কেউ কাঠ-টিন দিয়েছেন, কেউ শ্রম দিয়েছেন, কেউ বিহারের নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন, কেউ ভিক্ষু সংঘের সেবা করেছেন, আবার কেউ নীরবে জীবনের সামর্থ্য অনুযায়ী ধর্মীয় কাজে অবদান রেখেছেন।
তাঁদের প্রত্যেকের অবদান সমানভাবে মূল্যবান।
কারণ ইতিহাস শুধু বিখ্যাত মানুষের হাতে তৈরি হয় না; নীরবে কাজ করে যাওয়া সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অবদানেই ইতিহাসের ভিত নির্মিত হয়।
তাই গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি বিহারের অতীত সংরক্ষণ করা নয়; বরং একটি জনপদের মানুষের আত্মত্যাগ, বিশ্বাস, ধর্মচেতনা ও মানবিকতার ইতিহাস সংরক্ষণ করা।
উপসংহার—একটি বিহার, এক দীর্ঘ ইতিহাস, এক অনন্ত প্রত্যয়
গুমানমর্দন শান্তি বিহার আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও অধিক সময়ের স্মৃতি, সাধনা, দান ও সংগ্রাম।
একটি ক্ষুদ্র কুঁড়েঘর সদৃশ আর্য বিহার থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শান্তি বিহার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ; দানশীল পূর্বপুরুষদের ভূমি ও অর্থদান; ঝুঁইচান বলীর কাঠ-টিনের বিহার নির্মাণ; রাম মহাজন, মহিমা ঠাকুর, মহারাজ, যোগেন্দ্র নাথ মুৎসুদ্দী, ডাঃ সুধাংশু বিমল বড়ুয়া এবং অন্যান্য দাতার ভূমিদান; দুর্যোগে ধ্বংসের পর পুনর্গঠন; ১৯৬১ সালে নতুন পাকা বিহার নির্মাণ; বোধিবৃক্ষের আগমন; অসংখ্য ভিক্ষু-মহাথেরের ধর্মীয় নেতৃত্ব; ভদন্ত আর্যশ্রী মহাথেরের দীর্ঘ দায়িত্বকাল; নতুন বিহার নির্মাণের স্বপ্ন; ২০১৮ সালের নির্মাণ উদ্যোগ; এবং ২০২৩ সাল থেকে বর্তমান বিহারাধ্যক্ষ স্থবির এম. ধর্মবোধি ভান্তের নেতৃত্বে ধর্মীয় পরিবেশকে আরও গতিশীল করার প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাস এক অনন্য ধারাবাহিকতার নাম।
এই ইতিহাস আমাদের শেখায়—একটি প্রতিষ্ঠান তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
গুমানমর্দন শান্তি বিহার তাই শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়। এটি একটি পুণ্যস্মৃতি; এটি একটি ঐতিহ্যের ধারক; এটি একটি আধ্যাত্মিক আশ্রয়; এটি একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র; এটি একটি সামাজিক সম্প্রীতির মিলনভূমি; এটি বহু মানুষের ত্যাগ, দান ও আত্মনিবেদনের জীবন্ত স্মারক।
বোধিবৃক্ষের শীতল ছায়া যেমন পথিককে প্রশান্তি দেয়, তেমনি গুমানমর্দন শান্তি বিহার যুগের পর যুগ মানুষের অন্তরে শান্তি ও ধর্মের আলো জ্বালিয়ে যাক।
এখানে উচ্চারিত হোক বুদ্ধের মৈত্রীর বাণী, জাগ্রত হোক করুণার চেতনা, বিকশিত হোক প্রজ্ঞার আলো। নতুন প্রজন্ম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে সত্য, শীল, সংযম, মৈত্রী ও মানবতার পথে এগিয়ে যাক। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় হোক। বিহারের পবিত্র অঙ্গনে আগত প্রতিটি মানুষ যেন কিছুটা প্রশান্তি, কিছুটা প্রজ্ঞা এবং কিছুটা মানবিকতার আলো নিয়ে ফিরে যেতে পারে—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
যাঁরা অতীতে এই পুণ্যভূমির জন্য ভূমি দিয়েছেন, অর্থ দিয়েছেন, শ্রম দিয়েছেন, ধর্মীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং নিজেদের জীবন ও সামর্থ্য উৎসর্গ করেছেন—তাঁদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
তাঁদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। সেই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের কর্তব্য।
গুমানমর্দন শান্তি বিহারের ইতিহাস অম্লান থাকুক।
পূর্বপুরুষদের পুণ্যকীর্তি চিরস্মরণীয় হোক।
বুদ্ধের শান্তির বাণী ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক।
ধর্মের আলো অন্ধকার দূর করুক।
মৈত্রীর বন্ধন আরও দৃঢ় হোক।
মানবতার জয় হোক।
সকল প্রাণীর কল্যাণ হোক।
গুমানমর্দন শান্তি বিহার যুগের পর যুগ হয়ে থাকুক—
ধর্মের আলোয় আলোকিত এক পুণ্যতীর্থ,
মৈত্রীর এক শান্ত আশ্রয়,
মানবতার এক উজ্জ্বল প্রেরণাকেন্দ্র,
এবং বহু প্রজন্মের সাধনা ও আত্মনিবেদনের এক অমর স্মারক।
**এই পুণ্যতীর্থের ইতিহাস অম্লান থাকুক;
বুদ্ধের শান্তি, ধর্মের আলো এবং সংঘের মৈত্রী
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হোক।**
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।