ঘুম থেকে ওঠার পর পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শরীরকে ধীরে ধীরে সক্রিয় করা ভালো অভ্যাস। যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ মেপে তারিখসহ লিখে রাখতে পারেন। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে সেবন করা জরুরি।
সকালের নাশতায় অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনি এড়িয়ে ওটস, চিড়া, লাল আটার রুটি, শাকসবজি, ডাল বা পরিমিত ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। দুপুর ও রাতের খাবারে বেশি পরিমাণ শাকসবজি রাখার পাশাপাশি মাছ, ডাল বা পরিমিত চর্বিহীন মাংস রাখা যেতে পারে। ভাত বা রুটির পরিমাণ প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত রাখা ভালো।
অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত মিষ্টি এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো উচিত। ফলমূল ও স্বাস্থ্যকর বাদাম পরিমিত পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। শারীরিকভাবে সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে মোট প্রায় ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম, যেমন দ্রুত হাঁটা, একটি প্রচলিত লক্ষ্য।
যারা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, তারা প্রথমে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। তবে হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে ব্যায়ামের ধরন চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা উচিত।
একটানা দীর্ঘসময় বসে না থেকে প্রতি ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরপর উঠে কয়েক মিনিট হাঁটা বা শরীর নড়াচড়া করার অভ্যাস করা যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘসময় বসে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিকারক। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের দেওয়া রক্তচাপের ওষুধ নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। কয়েক দিন রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা নিরাপদ নয়।

ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত রক্তে শর্করা ও HbA1c পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। একইভাবে কোলেস্টেরল, বিশেষ করে LDL কোলেস্টেরল, বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজন অনুযায়ী লিপিড প্রোফাইল, কিডনির কার্যকারিতা এবং অন্যান্য পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শে করা যেতে পারে।
সিগারেট, জর্দা, গুলসহ তামাকজাত দ্রব্য রক্তনালী ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনসহ কিছু হৃদ্রোগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বুক ধড়ফড়, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা এ ধরনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে ECG বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্য নিজের ইচ্ছায় অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডোগ্রেল, স্ট্যাটিন বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। আবার চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধও নিজের সিদ্ধান্তে বন্ধ করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে আগে স্ট্রোক বা TIA হয়ে থাকলে, হৃদ্যন্ত্রের নির্দিষ্ট রোগ থাকলে অথবা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন থাকলে চিকিৎসকের নির্ধারিত চিকিৎসা নিয়মিত অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে এমন ব্যক্তিরা প্রতিদিনের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি লিখে রাখতে পারেন। যেমন—
সকালের রক্তচাপ
সন্ধ্যার রক্তচাপ
প্রয়োজন হলে রক্তে শর্করা
কত মিনিট হাঁটলেন
নির্ধারিত ওষুধ গ্রহণ করেছেন কি না
অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিয়েছে কি না
এ ধরনের রেকর্ড চিকিৎসকের কাছে রোগীর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বোঝাতে সহায়ক হতে পারে।
হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া, হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা, হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হওয়া কিংবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথা—এসব স্ট্রোকের সম্ভাব্য সতর্কসংকেত।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে কয়েক মিনিট পর ভালো হয়ে গেলেও বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোক প্রতিরোধ শুধু একটি ওষুধের ওপর নির্ভর করে না। নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা, তামাক বর্জন, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ—সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে একটি স্ট্রোক-প্রতিরোধী জীবনযাপন।
সুস্থ মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের জন্য আজকের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।