1. arkobd1@gmail.com : arkobd :
  2. dharmobodi88@gmail.com : স্থবির এম ধর্মবোধি : এম ধর্মবোধি স্থবির

প্রয়োজনীয়ঃ
আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট,সফটওয়্যার কিংবা মোবাইল এপ তৈরি করতে আজই যোগাযোগ করুনঃ ০১৯০৭৯৮৬৩৬৯ আমরা যেসব সার্ভিস দিয়ে থাকিঃ বিজনেস ওয়েবসাইট,ই-কমার্স ওয়েবসাইট,সোশ্যাল ওয়েবসাইট,অনলাইন নিউজপেপার,বেটিং ওয়েবসাইট,কেনা বেচার ওয়েবসাইট,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ইত্যাদি। আমরা আরো যেসব সেবা দিয়ে থাকিঃ সুপারশপ সফটওয়্যার,ফার্মেসি সফটওয়্যার,ক্লথিং/বুটিক ষ্টোর সফটওয়্যার,একাউন্টিং সফটওয়্যার,HRM ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার,স্কুল/কলেজ ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার সহ সকল ধরনের মোবাইল এপ তৈরি করে থাকি আপনার বাজেটের মধ্যেই। তো দেরি না করে আজই যোগাযোগ করুন এবং অর্ডার করুন আপনার চাহিদা মত সেবা। ফিউচার টেক বিডি
শিরোনামঃ
লালমাইয়ে সম্পত্তি বিরোধের জেরে বৌদ্ধ পরিবারে হামলা; আহত ২ দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর হবে ৬ প্রকল্পে চট্টগ্রাম। লিভার ক্যানসারের ৯ লক্ষণ সাধারণ ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন না তো? এডভোকেট রিক্তা বড়ুয়া অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ভদন্ত বোধিপ্রিয় ভিক্ষু দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অকাল প্রয়াণ করেছেন মিথ্যাদৃষ্টি, ভ্রান্তধারনা ও তান্ত্রিকতায় প্রতারনা! বুদ্ধ দর্শন বিশ্বাস করে কি? ধর্মান্তর একটি অভিশাপ, প্রকৃত ধার্মীক কখনো ধর্মান্তর হন না আর্জেন্টিনা না পারলে ব্রাজিলকে সমর্থন দেবেন মেসিদের কোচ জিতলে নকআউট হারলে বিদায়, ড্র করলে সমীকরণ মেলাতে হবে মেসিদের দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ কারা?

ধ্যানসাধনা ও বুদ্ধত্ব লাভ,রাজগৃহ নগরে সিদ্ধার্থের ভিক্ষাচরণ

  • আপডেটের সময়ঃ শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ৬৫ বার পঠিত

ধ্যানসাধনা ও বুদ্ধত্ব লাভ,রাজগৃহ নগরে সিদ্ধার্থের ভিক্ষাচরণ


সংকলনে ও সম্পাদনায়- স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে

প্রকাশক ও সম্পাদক- জ্ঞান অন্বেষণ অনলাইন নিউউ পৌর্টাল। 


সিদ্ধার্থ তাঁর চির আকাঙ্ক্ষিত প্রব্রজ্যা অবলম্বন করলেন। তখন সেই প্রদেশে অনুপ্রিয় নামে এক রমণীয় আমবাগান ছিল। সেখানে তিনি প্রব্রজ্যাজনিত পরমানন্দে এক সপ্তাহ কাটাবার পর পায়ে হেঁটে একদিনেই ত্রিশ যোজন পথ অতিক্রম করে রাজগৃহ নগরে পৌঁছালেন। নগরসীমায় প্রবেশ করে সিদ্ধার্থ ধনী-গরিব কোনো ঘর বিচার না করে প্রতি দরজায় দরজায় ভিক্ষা সংগ্রহ করছিলেন।

সিদ্ধার্থের অতুলনীয় রূপের জৌলুসে সারা নগর এক অপরূপ শোভা ধারণ করল। অতুলনীয় দেহসৌন্দর্যের অধিকারী এই মহাপুরুষকে দেখে নগরবাসী বিস্ময়াবিষ্ট ও সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এবং তা দেখে সবার মনে হলো যেন রাজগৃহ নগরে কোনো ধনপাল হাতির আবির্ভাব ঘটেছে, কিংবা দেবনগরে অসুর রাজা দেবনগরে প্রবেশের মতো সারা নগরীতে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। নগররক্ষী রাজপুরুষেরা তৎক্ষণাৎ রাজার কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত বর্ণনা করল, ‘প্রভু, নগরে এই রকম একজন পুরুষ দরজায় দরজায় ভিক্ষা করছেন। তিনি কি দেবতা, মানব অথবা কি নাগ, কিংবা সুপর্ণ প্রকৃতই কে এই পুরুষ আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’ রাজা স্বয়ং প্রাসাদের ওপর উঠে সেই মহান পুরুষকে দেখে নিজেও চমৎকৃত হলেন এবং তখনই রাজপুরুষদের আদেশ দিলেন, ‘যাও, তোমরা তাঁর পিছু অনুসরণ করো এবং লক্ষ রাখো। যদি এই পুরুষ অমনুষ্য হন, তা হলে নগরসীমার বাইরে গিয়ে অদৃশ্য হবেন, যদি দেবতা হন আকাশমার্গে উধাও হয়ে যাবেন, যদি নাগরাজ হন মাটি ভেদ করে অদৃশ্য হবেন, আর যদি মানুষ হন কোথাও বসে ভিক্ষালব্ধ অন্ন ভোজন করবেন।’

সেই মহান পুরুষ মিশ্রিত ভাত সংগ্রহ করে ‘এটাই আমার দিনযাপনের পক্ষে যথেষ্ট’ এই চিন্তা করে যেই দরজা দিয়ে নগরে প্রবেশ করেছিলেন সেই দরজা দিয়েই নগর হতে বের হলেন এবং পণ্ডব পর্বতের ছায়ায় পূর্বদিকে মুখ করে বসে ভিক্ষান্ন ভোজন করা শুরু করলেন। কিন্তু মুখে দেওয়া অন্ন ঘৃণায় তাঁর নাড়িভুঁড়ি ওলটে মুখ দিয়ে বের হবার অবস্থা হলো। কারণ, এরূপ নিকৃষ্ট খাদ্য তিনি জীবনে কখনো চোখেও দেখেননি। অতএব ভিক্ষালব্ধ সেই নিকৃষ্ট খাদ্যের প্রতি প্রবল ঘৃণার উদ্রেক হলেও সিদ্ধার্থ এরূপ নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন, ‘সিদ্ধার্থ, তুমি অন্নপানীয় সুলভ এমন বংশে তিন বছর পুরোনো সুগন্ধি শালিধানের ভাত ও প্রচুর সুস্বাদু ব্যঞ্জন যেখানে সহজলভ্য, সেরূপ প্রভূত সম্পদশালী রাজপরিবারে জন্ম নিয়েও এক পাংশুকূলধারী প্রব্রজিত পুরুষ দেখে ‘কখন আমিও এরূপ ভিক্ষান্নে জীবনযাপন করব, আমার সে সময়টা আসবে কি না’ এই উদ্দেশ্য নিয়েই বের হয়েছ। আর তুমি এখন এসব কী করছ!’ এরূপ নিজেকে নিজে উপদেশ দিয়ে তিনি নির্বিকার চিত্তে সেই ভিক্ষালব্ধ অন্ন ভোজন করলেন।—অপদান অর্থকথা, প্রব্রজ্যাসূত্র, সুত্তনিপাত

সিদ্ধার্থ ও মগধরাজ বিম্বিসার

রাজপুরুষেরা সব ব্যাপারগুলো দেখে তা তখনই রাজাকে জানালেন। রাজপুরুষদের মুখে সেই খবর শোনামাত্রই রাজা বিম্বিসার শিগগিরই নগরসীমার বাইরে সিদ্ধার্থের কাছে এলেন। তিনি প্রব্রজিতের ভুবনমোহন রূপ, মহান ঔদার্য এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হলেন। তিনি অনুমান করলেন, এই মহাপুরুষ নিশ্চয়ই কোনো রাজপুত্র হবেন। কিন্তু কোন দুঃখে রাজপুত্র সন্ন্যাসী হয়ে পথে পথে ভিক্ষা করছেন? সিদ্ধার্থকে দেখে শ্রদ্ধান্বিত হয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ রাজত্ব দিতে চাইলেন। বললেন, ‘আপনি এই তরুণ বয়সে সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন করার কোনো হেতু দেখছি না, আপনি আমার রাজ্যসম্পদ গ্রহণ করে সুখে জীবনযাপন করুন।’ তার উত্তরে সিদ্ধার্থ বললেন, ‘মহারাজ, আপনার নিশ্চয়ই অজানা নয় যে, হিমালয়ের পাদদেশে কপিলবাস্তু রাজ্যের সূর্যবংশীয় রাজা শুদ্ধোদন রাজত্ব করছেন। তাঁরই একমাত্র উত্তরাধিকারী আমি। সিদ্ধার্থ গৌতম আমার নাম। আমার পিতা রাজা শুদ্ধোদন আমার ভোগবিলাসের জন্য অভূতপূর্ব আয়োজন করেছিলেন। আমি সেই ভোগবিলাসে একনাগারে উনত্রিশটি বছর কাটিয়ে ছিলাম। কিন্তু ভোগবিলাস, আমোদপ্রমোদ আমাকে শান্তি দিতে পারেনি। জরা, ব্যাধি, মরণ মানুষের প্রকৃত শান্তিকে হরণ করে। ভোগ, লোভ, দ্বেষ, তৃষ্ণার বৃদ্ধি হয়। এই লোভ, দ্বেষ, তৃষ্ণা হচ্ছে মানুষের অশান্তির কারণ। আমি প্রকৃত সুখশান্তির অন্বেষায় স্ত্রী-পুত্র, মাতাপিতা, আত্মীয়স্বজন এবং বিপুল রাজৈশ্বর্য পরিত্যাগ করে অনন্ত শান্তির অন্বেষায় বের হয়েছি। এই শান্তি হচ্ছে সব ভোগবিলাস, কামনাবাসনা লোভ-দ্বেষ-মোহের নিবৃত্তি; জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর অবসানে পরম শান্তিপ্রদ নির্বাণ। তাই আমি এই নির্বাণ সাক্ষাতের জন্য, পরম সম্বোধি লাভ করে বুদ্ধ হবার জন্য প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছি।’

তখন সিদ্ধার্থ রাজা বিম্বিসারকে বললেন, ‘মহারাজ, বিষয়কাম কিংবা ক্লেশকাম কোনোটাই আমার প্রয়োজন নেই, আমি পরম সম্বোধি লাভের উদ্দেশ্যেই গৃহত্যাগ করেছি।’ রাজা নানাপ্রকারে অনুরোধ করেও তাঁকে সম্মত করাতে না পেরে শেষে বললেন, ‘আপনি অবশ্যই বুদ্ধ হতে পারবেন। যাহোক আপনার প্রতি আমার একটা অনুরোধ রইল, বুদ্ধত্ব লাভ করে প্রথমেই আমার রাজ্যে আসতে হবে, এই বলে সিদ্ধার্থের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করলেন।’—অপদান অর্থকথা

সিদ্ধার্থ ও আড়ার-কালাম

মগধরাজ বিম্বিসারকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিদ্ধার্থ আপন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো সদ্‌গুরুর পরামর্শ লাভের আকাঙ্ক্ষায় বন-তপোবন, গ্রাম-গ্রামান্তর, নগর পরিভ্রমণ করতে লাগলেন। সে সময় ‘আড়ার-কালাম’ নামে এক বিখ্যাত যোগী একনিষ্ঠ সাধনার বলে সমকালে শ্রেষ্ঠ যোগীরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করে বৈশালীতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে তিনি স্বশিষ্যে অবস্থান করছেন। তা শুনে সিদ্ধার্থ কুশল কী সন্ধানে এবং অনুত্তর শান্তিবরপদ নির্বাণ অন্বেষণে আড়ার-কালামের কাছে গিয়ে বললেন, ‘কালাম, আমি তোমার ধর্মবিনয়ে ব্রহ্মচর্য আচরণ করতে ইচ্ছা করি।’ আড়ার-কালাম তাঁকে বললেন, ‘আপনি এখানে থাকুন। সেরূপ এই ধর্মতত্ত্ব যাতে বিজ্ঞ ব্যক্তি অচিরে নিজেই নিজের গুরু হয়ে, নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা তা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করতে পারেন।’ সিদ্ধার্থ অচিরে, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ধর্ম আয়ত্ত করেন, ওষ্ঠপ্রহত এবং উচ্চারিত হতে না হতে তিনি সেই জ্ঞানবাদ বলতে পারেন, সেই স্থবিরবাদ জানতে পারেন, দেখতে পান, এর বৈশিষ্ট্যও জানতে পারেন, শুধু আমি নই অপরাপর ব্যক্তিও তা অনায়াসে জানতে পারে। তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়, ‘আড়ার-কালাম শুধু বিশ্বাসের ওপর নয়, এই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করেই অবস্থান করেন বলে তিনি তা প্রকাশ করেন। নিশ্চয় তিনি এই ধর্ম নিজে জেনে এবং দেখে এতে অবস্থান করেন।’ তারপর সিদ্ধার্থ কালামের কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, ‘কালাম, ধ্যানের কোন স্তর পর্যন্ত এই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তুমি এতে অবস্থান করো?’ এভাবে জিজ্ঞাসিত হলে আড়ার-কালাম বললেন, ‘আকিঞ্চনায়তন নামক অরূপধ্যানস্তর পর্যন্ত।’ তখন সিদ্ধার্থের মনে এই চিন্তা উদয় হয়, ‘শুধু যে আড়ার-কালামের শ্রদ্ধা আছে তা নয়, আমারও আছে শ্রদ্ধা, শুধু যে তাঁর বীর্য আছে তা নয়, আমারও আছে বীর্য, শুধু যে তাঁর স্মৃতি আছে তা নয়, আমারও আছে স্মৃতি, শুধু যে তাঁর সমাধি আছে তা নয়, আমারও আছে সমাধি, শুধু যে তাঁর প্রজ্ঞা আছে তা নয়, আমারও আছে প্রজ্ঞা। অতএব তিনি যে-ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করেন বলে প্রকাশ করেন, আমিও সেই ধর্ম সাক্ষাৎ করার প্রয়াসী হবো।’ সিদ্ধার্থ অচিরে, অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই ধর্ম অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করতে লাগলেন। তারপর সিদ্ধার্থ আড়ার-কালামের কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, ‘কালাম, এই ধ্যানস্তর পর্যন্তই তো তুমি এই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করো বলে প্রকাশ করো?’ ‘হ্যাঁ, এই পর্যন্তই বটে।’ এরপর সিদ্ধার্থ কালামকে বললেন, ‘কালাম, আমিও তো এই ধ্যানস্তর পর্যন্ত নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করতে পারি।’ কালাম বললেন, ‘এটা আমাদের মহালাভ, সুলব্ধ সৌভাগ্য যে, আমরা আপনার মতো সব্রহ্মচারী দেখতে পাচ্ছি। আমি যে-ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করি বলে প্রকাশ করি, তুমিও সেই ধর্ম অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করতে পারো। তুমি যে-ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করো, ঠিক সেই ধর্মই আমি নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করি বলে প্রকাশ করি। এভাবে যে-ধর্ম আমি জানি তা তুমি জানো, যে-ধর্ম তুমি জানো তা আমি জানি; আমি যেরূপ তুমি সেরূপ, তুমি যেরূপ আমি সেরূপ। অতএব, বন্ধু, আসো, এখন হতে আমরা উভয়ে একসঙ্গে বাস করে এই শিষ্যদের পরিচালিত করি।’ আড়ার-কালাম সিদ্ধার্থের আচার্য (শিক্ষাগুরু) হয়েও অন্তেবাসী সিদ্ধার্থকে তাঁর সমস্থানে স্থাপন করলেন, উদারভাবে তাঁকে সম্মান করলেন। তখন সিদ্ধার্থের মনে এই চিন্তা হলো, ‘এই ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞার অভিমুখে, সম্বোধির অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। এর গতি তো আকিঞ্চনায়তন পর্যন্ত।’ সিদ্ধার্থ এই ভেবে সেই ধর্ম পর্যাপ্ত মনে না করে তা হতে অনাসক্তভাবে চলে গেলেন।—মহাসত্যক সূত্র, মধ্যমনিকায়

সিদ্ধার্থ ও রামপুত্র রুদ্রক

এরপর কুশল কী সন্ধানে, অনুত্তর শান্তিবরপদ অন্বেষণে সিদ্ধার্থ রামপুত্র রুদ্রকের কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, ‘রাম, আমি তোমার ধর্মবিনয়ে ব্রহ্মচর্য আচরণ করতে ইচ্ছা করি।’ রামপুত্র সিদ্ধার্থকে বললেন, ‘আপনি এখানে থাকুন। সেরূপ এই ধর্মতত্ত্ব যাতে বিজ্ঞ ব্যক্তি অচিরে নিজেই নিজের গুরু হয়ে নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা তা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করতে পারেন।’ সিদ্ধার্থ অচিরে, অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই ধর্ম আয়ত্ত করলেন। ওষ্ঠপ্রহত এবং উচ্চারিত হতে না হতেই তিনি সেই জ্ঞানবাদ বলতে পারলেন, সেই স্থবিরবাদ জানতে পারলেন, দেখতে পেলেন; এর বৈশিষ্ট্যও জানতে পারলেন, শুধু আমি নই, অপরাপর ব্যক্তিও তা জানতে পারে। তখন সিদ্ধার্থের মনে এই চিন্তা উদয় হয়, ‘রামপুত্র শুধু শ্রদ্ধার ভিত্তির ওপর নয়, এই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করেই তাতে অবস্থান করেন বলে তিনি তা প্রকাশ করেন। নিশ্চয় তিনি এই ধর্ম স্বয়ং জেনে দেখে এতে অবস্থান করেন।’ তারপর সিদ্ধার্থ রামের কাছে গিয়ে বললেন, ‘রাম, ধ্যানের কোন স্তর পর্যন্ত এই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তুমি এতে অবস্থান করো?’ এটা জিজ্ঞাসিত হলে রামপুত্র বললেন, ‘নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন নামক অরূপধ্যানস্তর পর্যন্ত।’ তখন সিদ্ধার্থের মনে এই চিন্তা উদয় হয়, ‘শুধু যে রামপুত্রের শ্রদ্ধা আছে তা নয়, আমারও আছে শ্রদ্ধা, শুধু যে তাঁর বীর্য আছে তা নয়, আমারও আছে বীর্য, শুধু যে তাঁর স্মৃতি আছে তা নয়, আমারও আছে স্মৃতি, শুধু যে তাঁর সমাধি আছে তা নয়, আমারও আছে সমাধি, শুধু যে তাঁর প্রজ্ঞা আছে তা নয়, আমারও আছে প্রজ্ঞা। অতএব তিনি যে-ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করেন বলে প্রকাশ করেন আমিও সেই ধর্ম সাক্ষাৎ করার জন্য প্রয়াসী হবো।’ সিদ্ধার্থ অচিরে, অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই ধর্ম অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করেন। তারপর সিদ্ধার্থ রামপুত্রের কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, ‘রাম, এই ধ্যানস্তর পর্যন্তই তো তুমি এই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করো বলে প্রকাশ করো?’ ‘হ্যাঁ, তাই বটে।’ ‘রাম, আমিও এই ধ্যানস্তর পর্যন্ত এই ধর্ম অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করতে পারি।’ তিনি বললেন, ‘এটা তো আমাদের মহালাভ, সুলব্ধ সৌভাগ্য যে, আমরা আপনার মতো সব্রহ্মচারী দেখতে পাচ্ছি। আমি যেই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করি বলে প্রকাশ করি, তুমিও সেই ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করতে পারো। তুমি যে-ধর্ম নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে এতে অবস্থান করো, ঠিক সেই ধর্ম আমি নিজ অভিজ্ঞার দ্বারা সাক্ষাৎ করে তাতে অবস্থান করি বলে প্রকাশ করি। এভাবে যে-ধর্ম আমি জানি তা তুমি জানো, যে-ধর্ম তুমি জানো তা আমি জানি; আমি যেরূপ তুমি সেরূপ, তুমি যেরূপ আমি সেরূপ। অতএব, বন্ধু, আসো, এখন হতে আমরা উভয়ে একসঙ্গে বাস করে এই শিষ্যদের পরিচালিত করি।’ রামপুত্র রুদ্রক সিদ্ধার্থের আচার্য (শিক্ষাগুরু) হয়েও অন্তেবাসী তাঁকে তাঁর সমস্থানে স্থাপন করলেন। তখন সিদ্ধার্থের মনে এই চিন্তা উদয় হয়, ‘এই ধর্ম নির্বেদের অভিমুখে, বিরাগের অভিমুখে, নিরোধের অভিমুখে, উপশমের অভিমুখে, অভিজ্ঞার অভিমুখে, নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তিত হয় না। এর গতি নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন নামক অরূপধ্যান পর্যন্ত।’ সিদ্ধার্থ এই ভেবে সেই ধর্ম পর্যাপ্ত মনে না করে তা হতে অনাসক্তভাবে চলে গেলেন।—মহাসত্যক সূত্র, মধ্যমনিকায়

কঠোর সাধনা অনুশীলন

এরপর সিদ্ধার্থ ঋষি আড়ার-কালামের কাছে লৌকিক ধ্যানের সপ্তম স্তর এবং রামপুত্র রুদ্রকের কাছে লৌকিক ধ্যানের অষ্টম স্তর অধিগত ও উপলব্ধি করে এবং এটা সর্বজ্ঞতা জ্ঞান নয় মনে করে কুশল কী সন্ধানে, অনুত্তর শান্তিবরপদ অন্বেষণে (সিদ্ধার্থ) মগধরাজ্যে ক্রমাগত বিচরণ করতে করতে যেখানে উরুবেলা মহাবেলা, যেখানে সেনানিগম তার দিকে এগিয়ে চললেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন এক অতি রমণীয় ভূমিভাগ, এক মনোহর বনখণ্ড, অদূরে স্বচ্ছসলিলা সুন্দর ঘাটযুক্ত নদী প্রবাহমানা এবং চারদিকে রমণীয় গোচরগ্রাম। তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়, ‘এই তো সেই রমণীয় ভূভাগ এবং মনোহর বনখণ্ড, অদূরে স্বচ্ছসলিলা সুন্দর ঘাটযুক্ত প্রবাহমানা নদী এবং চারদিকে রমণীয় গোচরগ্রাম। সাধনাপ্রয়াসী কুলপুত্রের পক্ষে এই তো সেই সাধনার স্থান!’ এই ভেবে সাধনার পক্ষে এ স্থান পর্যাপ্ত মনে করে সেখানেই তিনি বসলেন।

সেখানে কঠোর সাধনারত সিদ্ধার্থ চরম কৃচ্ছসাধনে সংকল্পবদ্ধ হয়ে সব রকমের আহার পরিত্যাগ করলেন। যখন কোনো রাখালকে, পশুপালককে, ঘাস সংগ্রহকারীকে, কাঠ সংগ্রহকারীকে, অথবা বনে ফলমূলসন্ধানকারীকে (বনকর্মীকে) দেখেছেন, তখন তিনি বন হতে বনে, গভীর হতে গভীরে, নিচু হতে নিচু জায়গায়, উঁচু হতে উঁচু জায়গায় গিয়ে পড়েছেন, যাতে তাঁরা তাঁকে দেখতে না পায়, তিনিও তাদের দেখতে না পান। যেমন বনে বিচরণকারী হরিণ মানুষকে দেখে বন হতে বনে, গভীর হতে গভীরে, নিচু হতে নিচু জায়গায়, উঁচু হতে উঁচু জায়গায় ছুটে যায়, তেমনভাবেই যখনই তিনি কোনো রাখালকে, পশুপালককে, ঘাস সংগ্রহকারীকে, কাঠ সংগ্রহকারীকে, বনকর্মীকে দেখেছেন, তখনই তিনি বন হতে বনে, গভীর হতে গভীরে, নিচু হতে নিচু জায়গায়, উঁচু হতে উঁচু জায়গায় গিয়ে পড়েছেন, যাতে তারা তাঁকে দেখতে না পায়, তিনিও তাদের দেখতে না পান।

যখন গোয়াল হতে সব গাভি চলে গেছে, রাখালেরাও চলে গেছে, তখন হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে গিয়ে স্তন্যপায়ী তরুণ বাছুরের গোময় তিনি আহার করেছেন। ভূপতিত হবার আগেই নিজের মলমূত্র গ্রহণ করে খেয়েছেন। কখনো-বা অপর কোনো এক ভীষণ বনে প্রবেশ করে বিচরণ করেছেন। সেই বনের ভীষণতা এই যে, যে-কেউ অবীতরাগ হয়ে তাতে প্রবেশ করে, বহুল পরিমাণে তার রোমাঞ্চ উপস্থিত হয়।

শীত ও হেমন্ত ঋতুতে, হিমপাত সময়ে, অন্তর-অষ্টকায় যেসব বিভীষিকাপূর্ণ রাত সেসব রাতে সারারাত উন্মুক্ত আকাশতলে এবং সারাদিন বনে বিচরণ করেছেন। গ্রীষ্ম ঋতুর শেষ মাসের দিনে উন্মুক্ত আকাশের নিচে এবং রাতে বনে বিচরণ করেছেন। সে সময় তাঁর অন্তরে এই অশ্রুতপূর্ব আশ্চর্য ভাবোদ্দীপক গাথা স্ফূর্ত হয়েছিল :

তপ্ত, সিক্ত, একা আমি ভীষণ সে বনে।

নগ্ন অচেলক মুনি আসীন আসনে

অগ্নি বিনা, মৌন ধ্যায়ী লক্ষ্যের সাধনে॥

তিনি শ্মশানে মৃত লোকের হাড়গুলোকে বালিশরূপে মাথায় দিয়ে শয়ন করেছেন। এমনও ঘটেছে যে, রাখালেরা তাঁর কাছে এসে শরীরে থুতু নিক্ষেপ করেছে, কানের ছিদ্রে শলাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে, অথচ তিনি বিশেষভাবে জানেন যে, কখনো তাদের প্রতি তিনি পাপচিত্ত উৎপন্ন করেননি।

তিনি বিশেষভাবে জানেন যে, তিনি দিনে মাত্র একটি কুলে আহার শেষ করেছেন। মনে হতে পারে, তখন ভুক্ত কুলটি বুঝি অতি বড়ো ছিল। বিষয়টা ঠিক এমন নয়। এখন যেমন, তখনও কুলটি ঠিক এই আকারেই ছিল। দিনে মাত্র একটি কুলে আহার শেষ করতে গিয়ে তাঁর দেহ অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষীণ হয়েছিল, যেমন অশীতলতা অথবা কাললতা সন্ধিস্থানে মিলিয়ে মধ্যভাগে উন্নত-অবনত হয়, তেমনভাবেই সেই অল্পাহারহেতু তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দুরবস্থা হয়েছিল, উটের পায়ের সংযোগস্থলের মতো তাঁর গুহ্যদ্বার বিরাট গর্তের মতো হয়েছিল। সেই অল্পাহারহেতু তাঁর পিঠের হাড় লাঠিতে প্যাঁচানো সুতাগুলোর মতো দেখতে উঁচুনিচু হয়েছিল। যেমন পুরোনো ঘরের বরগাগুলো এলোমেলো হয় তেমন অল্পাহারহেতু তাঁর বুকের হাড়গুলো এলোমেলো হয়েছিল। যেমন গভীর কুয়ায় প্রতিবিম্ব গভীর জলে প্রবেশ করে, তেমন সেই অল্পাহারহেতু চক্ষুকূপে চোখের তারা গভীরে প্রবেশ করেছিল। যেমন তিতা করলা কচি অবস্থায় ছিঁড়লে বাতাসের স্পর্শে শিগগিরই সংম্লান হয় তেমন অল্পাহারহেতু তাঁর মাথার চামড়া বাতাসের স্পর্শে ম্লান হয়েছিল।

সেই অল্পাহারহেতু তাঁর পেটের চামড়াটা এমনভাবে পিঠের হাড়ে লেগে গিয়েছিল যে, পেটের চামড়াটা ধরলে পিঠের হাড়টা ধরেছেন বলে মনে হয়েছে, পিঠের হাড়টা ধরলে পেটের চামড়াটা ধরেছেন বলে মনে হয়েছে। মলমূত্র ত্যাগ করতে গিয়ে সেখানেই কুঁজো হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছেন। সেই অল্পাহারহেতু শরীর চুলকাতে গিয়ে হাত দিয়ে গায়ে হাত বুলিয়েছেন, গায়ে হাত বুলাতে গিয়ে মূলে পচে যাওয়া লোমগুলো শরীর হতে ঝরে পড়েছে।—মহাসত্যক সূত্র, মহাসিংহনাদ সূত্র, মধ্যমনিকায়

তখন তাঁর কাছে তিনটি অশ্রুতপূর্ব অতি আশ্চর্য উপমা প্রতিভাত হয়েছিল। যেমন, তাজা ভেজা কাঠ পানিতে ফেলা হলো। তারপর কোনো ব্যক্তি আগুন জ্বালাবে, তেজ উৎপাদন করবে উদ্দেশ্যে উত্তরারণি নিয়ে সেখানে এসে পানিতে ফেলা তাজা ভেজা কাঠ উত্তরারণিতে মন্থন করে আগুন জ্বালাতে, তেজ উৎপাদন করতে পারবে না। ‘যেহেতু, কাঠ তাজা ও ভেজা, তার ওপর তা পানিতে ডুবানো, তার দ্বারা আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলে তাতে সেই ব্যক্তি শুধু শ্রমক্লান্তি এবং মনঃকষ্টেরই ভাগী হবে।’ সেরূপ, যে-কোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ কায়ত কাম্য বস্তু হতে বিচ্যুত হয়ে অবস্থান না করেন, যাদের মধ্যে কামচ্ছন্দ, কামস্নেহ, কামমূর্ছা, কামপিপাসা, কামপরিদাহ অধ্যাত্মে সুপরিক্ষীণ ও সুপ্রশমিত না হয়, তাঁরা সাধনাপ্রয়াসে তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর দুঃখবেদনা অনুভব করেন, তাঁদের পক্ষে অনুত্তর জ্ঞানদর্শন ও সম্বোধিলাভ অসম্ভব। এমনকি সাধনাপ্রয়াসে তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর দুঃখবেদনা অনুভব না করলেও তাঁদের পক্ষে অনুত্তর জ্ঞানদর্শন ও সম্যক সম্বোধিলাভ অসম্ভব। এই অশ্রুতপূর্ব অতি আশ্চর্য প্রথম উপমাই তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল।

অপর এক অশ্রুতপূর্ব অতি আশ্চর্য দ্বিতীয় উপমাও তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল। যেমন, তাজা ভেজা কাঠ আরকমিশ্রিত জল হতে স্থলে নিক্ষিপ্ত হলো। কোনো ব্যক্তি আগুন জ্বালাবে, তেজ উৎপাদন করবে উদ্দেশ্যে উত্তরারণি নিয়ে এসে ওই ব্যক্তি আরকমিশ্রিত জল হতে স্থলে নিক্ষিপ্ত, তাজা ও ভেজা কাঠ উত্তরারণিতে মন্থন করে আগুন জ্বালাতে, তেজ উৎপাদন করতে পারবে না। তা কিছুতেই সম্ভব নয়। এর কারণ কী? ‘আরকমিশ্রিত, জল হতে স্থলে নিক্ষিপ্ত, তাজা ও ভেজা কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলে তাতে ওই ব্যক্তি শুধু শ্রমক্লান্তি ও ব্যর্থতারই ভাগী হবে।’ সেরূপ যে-কোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ কায়ত কাম্য বস্তু হতে বিচ্যুত হয়ে অবস্থান করেন, কিন্তু তাদের মধ্যে কামচ্ছন্দ, কামস্নেহ, কামমূর্ছা, কামপিপাসা, (অথবা) কামপরিদাহ বলতে যা-কিছু তা অধ্যাত্মে সুপরিক্ষীণ হয়নি, সুপ্রশমিত হয়নি, সেই মহানুভব শ্রমণব্রাহ্মণগণও সাধনাপ্রয়াসে তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর দুঃখবেদনা অনুভব করেন, তাঁদের পক্ষে জ্ঞানদর্শন লাভ, অনুত্তর সম্বোধি লাভ অসম্ভব। এই অশ্রুতপূর্ব অতি আশ্চর্য দ্বিতীয় উপমাই তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল।

অপর এক অশ্রুতপূর্ব অতি আশ্চর্য তৃতীয় উপমাও তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল। যেমন, রসহীন শুকনো কাঠ আরকমিশ্রিত জল হতে স্থলে নিক্ষিপ্ত হলো। তারপর একজন ব্যক্তি আগুন জ্বালাবে, তেজ উৎপাদন করবে উদ্দেশ্যে উত্তরারণি নিয়ে সেখানে আসল। ওই ব্যক্তি আরকমিশ্রিত জল হতে স্থলে নিক্ষিপ্ত (স্নেহবিহীন) শুকনো কাঠ উত্তরারণিতে মন্থন করে আগুন জ্বালাতে, তেজ উৎপাদন করতে পারবে। এর কারণ কী? ‘যেহেতু, সেই স্নেহবিহীন শুকনো কাঠ আরকমিশ্রিত জল হতে স্থলে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।’ সেরূপ যে-কোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ কায়ত কাম্য বস্তু হতে বিচ্যুত হয়ে অবস্থান করেন এবং তাদের মধ্যে কামচ্ছন্দ, কামস্নেহ, কামমূর্ছা, কামপিপাসা অথবা কামপরিদাহ বলতে যা-কিছু তা অধ্যাত্মে সুপরিক্ষীণ, সুপ্রশমিত হয়, সাধনাপ্রয়াসে তাঁরা তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর দুঃখবেদনা অনুভব করলেও তাঁদের পক্ষে জ্ঞানদর্শন ও অনুত্তর সম্বোধিলাভ সম্ভব হয়; সাধনাপ্রয়াসে তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর দুঃখবেদনা অনুভব না করলেও তাঁদের পক্ষে জ্ঞানদর্শন ও অনুত্তর সম্বোধিলাভ সম্ভব হয়।

এই তিনটি অশ্রুতপূর্ব অতি আশ্চর্য উপমাই (তখন) তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল।

তখন তাঁর এই চিন্তা হয়েছিল, ‘আমি দাঁতে দাঁত চেপে, জিহ্বার দ্বারা তালু স্পর্শ করে চিত্তের দ্বারা চিত্ত অভিনিগৃহীত, অভিনিপীড়িত ও অভিসন্তপ্ত করব।’ এই ভেবে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে জিহ্বার দ্বারা তালু স্পর্শ করে চিত্তের দ্বারা চিত্ত অভিনিগৃহীত, অভিনিপীড়িত ও অভিসন্তপ্ত করেন। তা করার সময় তাঁর বগল থেকে ঘাম বের হয়। যেমন কোনো বলবান পুরুষ দুর্বল পুরুষকে মাথায় কিংবা ঘাড়ে ধরে অভিনিগৃহীত, অভিনিপীড়িত ও অভিসন্তপ্ত করে, তেমন দাঁতে দাঁত চেপে, জিহ্বার দ্বারা তালু স্পর্শ করে, চিত্তের দ্বারা চিত্ত অভিনিগৃহীত, অভিনিপীড়িত ও অভিসন্তপ্ত করলে তাঁর বগল হতে ঘাম বের হয়। তাঁর বীর্য আরব্ধ হয় যা শিথিল হবার নয়, স্মৃতি উপস্থাপিত হয় যা সম্মূঢ় হবার নয়।

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘এখন আমি শ্বাসপ্রশ্বাস-রহিত ধ্যান করব।’ তিনি মুখে ও নাকে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলেন। তাঁর মুখে ও নাকে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়ায় কানের ছিদ্র দিয়ে নির্গত বায়ুর অতি অধিক মাত্রায় শব্দ হতে থাকে। যেমন কামারের জাঁতা হতে বায়ু নির্গত হলে অধিক মাত্রায় শব্দ হয়, তেমন মুখে ও নাকে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়ায় কানের ছিদ্র দিয়ে নির্গত বায়ুর অধিক মাত্রায় শব্দ হতে থাকে।

তখন তিনি মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করেন। মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় বায়ু মূর্ধায় প্রতিহত হতে থাকে। যেমন কোনো বলবান পুরুষ তীক্ষ্ণ শিখর দিয়ে মাথায় আঘাত করে, তেমন মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় বায়ু মূর্ধায় প্রতিহত হয়।

তখন তিনি মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করেন। মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় তাঁর মাথাব্যথা উপস্থিত হয়। যেমন কোনো বলবান পুরুষ দৃঢ় চর্মখণ্ডে শিরোপা দেয়, তেমনভাবেই মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় তাঁর মাথাব্যথা উপস্থিত হয়।

তখন তিনি মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করেন। মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় বায়ু তাঁর পেট কাটতে থাকে। যেমন কোনো দক্ষ কসাই কিংবা কসাইয়ের শিষ্য তীক্ষ্ণ গোরুকাটার ছুরি দিয়ে গোরুর পেট কাটে, তেমনভাবেই মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় বায়ু তাঁর পেট কাটতে থাকে।

তখন তিনি মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করেন। মুখে নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় দেহে দাহ উপস্থিত হয়। যেমন দুইজন বলবান পুরুষ কোনো এক দুর্বলতর ব্যক্তির দুই বাহুতে ধরে জ্বলন্ত অঙ্গারে সন্তপ্ত ও সম্পরিতপ্ত করে, তেমনভাবেই মুখে, নাকে ও কানে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করলে অধিক মাত্রায় দেহে দাহ উপস্থিত হয়।

তখন কোনো কোনো অধিষ্ঠাত্রী দেবতা তাঁকে এই অবস্থায় দেখে বলে উঠল, ‘শ্রমণ গৌতম বুঝি মরেছেন।’ কোনো কোনো দেবতা বলল, ‘শ্রমণ গৌতম মরেননি, কিন্তু মরবেন।’ কোনো কোনো দেবতা বলে উঠল, ‘শ্রমণ গৌতম মরেননি, মরবেনও না, তিনি যে অর্হৎ, অর্হত্ত্বের ধ্যানবিহার এরূপই বটে।’

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘এখন আমি সব ধরনের খাদ্য খাওয়া বন্ধ করব।’ তখন একজন দেবতা তাঁর কাছে এসে বলল, ‘মহাশয়, আপনি তা করবেন না, সব ধরনের খাদ্য খাওয়া বন্ধ করতে যাবেন না। মহাশয়, যদি আপনি তা করেন, তা হলে আমরা আপনার লোমকূপ দিয়ে দিব্য শক্তি প্রবেশ করে দেব, যাতে আপনি দিনযাপন করবেন।’ তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘যদি আমি সব ধরনের খাদ্য খাওয়া বন্ধ করি, তা হলে এই সব দেবতা আমার লোমকূপ দিয়ে দিব্য শক্তি প্রবেশ করে দেবে এবং তাতে দিনযাপন করলে আমার ব্রত মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে।’ তখন তিনি ওই দেবতাদের বললেন, ‘তোমরা এরূপ করো না।’

এদের মধ্যে যারা বোধিসত্ত্ব মারা গেছেন বলে মনে করেছিল তারা শুদ্ধোদন মহারাজাকে গিয়ে জানাল, ‘তোমার ছেলে মারা গেছেন।’

‘আমার পুত্র বুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন নাকি বুদ্ধ না হয়ে মারা গেছেন?’

‘বুদ্ধ হতে পারেননি। সাধনাস্থলেই পড়ে গিয়ে মারা গেছেন।’

তা শুনে রাজা বললেন, ‘আমি তা বিশ্বাস করি না। আমার পুত্র বোধিজ্ঞান লাভ না করে মারা যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। রাজা কেন তা বিশ্বাস করেননি? কালদেবল তাপসের বন্দনার দিনে এবং জামগাছের নিচে সেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখে।

বোধিসত্ত্ব আবার হুঁশ ফিরে পাওয়ার পরে উঠে দাঁড়ালে সেই দেবতারা আবার গিয়ে রাজাকে জানাল, ‘মহারাজ, আপনার পুত্র রোগহীন।’ রাজা বললেন, ‘আমার পুত্র যে মরেনি সেটা আমি জানি।’ মহাসত্ত্বের এভাবে ছয় বছর ধরে করা কঠোর সাধনা আকাশে গিঁট দেয়ার মতো নিষ্ফল হলো।

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘এখন আমি অল্প অল্প, সামান্য সামান্য আহার করব, তা মুগডালের ঝোলই হোক, কুলত্থের যূষই হোক, মটরশুঁটির ঝোলই হোক অথবা অড়হরের ঝোলই হোক।’ তখন হতে তিনি অল্প অল্প, সামান্য সামান্য আহার করতে শুরু করেন, মুগডালের ঝোলই হোক, কুলত্থের ঝোলই হোক, মটরশুঁটির ঝোলই হোক অথবা অড়হরের ঝোলই হোক। তা করতে গিয়ে তাঁর দেহ অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষীণ হয়, যেমন অশীতলতা অথবা কাললতা সন্ধিস্থানে মিলিয়ে মধ্যভাগে উন্নত-অবনত হয়, তেমনভাবেই সেই অল্পাহারহেতু তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দুরবস্থা হয়, উঠের পায়ের সংযোগস্থলের মতো তাঁর গুহ্যদ্বার বিরাট গর্তের মতো হয়। সেই অল্পাহারহেতু তাঁর পিঠের হাড় লাঠিতে প্যাঁচানো সুতাগুলোর মতো দেখতে উঁচুনিচু হয়। যেমন পুরোনো বাড়ির বরগাগুলো এলোমেলো হয় তেমন অল্পাহারহেতু তাঁর বুকের হাড়গুলো এলোমেলো হয়। যেমন গভীর কুয়ায় প্রতিবিম্ব গভীর জলে প্রবেশ করে, তেমন সেই অল্পাহারহেতু চক্ষুকূপে চোখের তারা গভীরে প্রবেশ করে। যেমন তিতা করলা কচি অবস্থায় ছিঁড়লে বাতাসের স্পর্শে শিগগিরই ম্লান হয় তেমন অল্পাহারহেতু তাঁর মাথার চামড়া ম্লান হয়। সেই অল্পাহারহেতু তাঁর পেটের চামড়াটা এভাবে পিঠের হাড়ে লেগে গিয়েছিল যে, পেটের চামড়াটা ধরলে পিঠের চামড়াটা ধরেছেন বলে মনে হয়, পিঠের চামড়াটাকে ধরলে পেটের চামড়াটাকে ধরেছেন বলে মনে হয়। মলমূত্র ত্যাগ করতে গিয়ে সেখানেই কুঁজো হয়ে মাটিতে পড়েছেন। সেই অল্পাহারহেতু দেহ আশ্বস্ত করতে গিয়ে হাত দিয়ে গায়ে হাত বুলান, গায়ে হাত বুলাতে গিয়ে মূলে পচে যাওয়া লোমগুলো অঙ্গ হতে ঝরে পড়ে, তখন লোকেরা তাঁকে দেখে বলল, ‘শ্রমণ গৌতম একেবারে কালো হয়ে গেছেন।’ কেউ কেউ বলল, ‘শ্রমণ গৌতম কালো হননি, তিনি পাকা শ্যাম হয়েছেন।’ কেউ কেউ বলে উঠল, ‘শ্রমণ গৌতম কালোও হননি এবং পাকা শ্যামও হননি।’ সেই অল্পাহারহেতু তাঁর পরিশুদ্ধ ও পরিষ্কৃত দেহের বর্ণ অপকৃষ্ট হয়।

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘অতীতে যেসব শ্রমণব্রাহ্মণ সাধনাজনিত দুঃখ, তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর বেদনা অনুভব করেছিলেন, এটাই তার সেরা, এর অধিক আর কোনো বেদনা হতে পারে না। অনাগতে যেসব শ্রমণব্রাহ্মণ সাধনাজনিত দুঃখ, তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর বেদনা অনুভব করবেন, এটাই তার সেরা, এর অধিক আর কোনো বেদনা হতে পারে না। বর্তমানেও যেসব শ্রমণব্রাহ্মণ সাধনাজনিত দুঃখ, তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কঠোর বেদনা অনুভব করেন, এটাই তার সেরা, এর অধিক আর কোনো বেদনা হতে পারে না। কিন্তু তিনি এই দুষ্করচর্যার দ্বারা লোকাতীত ও অতীন্দ্রিয় জ্ঞানদর্শন লাভ করতে পারেননি। তাঁর মনে প্রশ্ন দেখা দিল, তবে কি বোধিলাভের জন্য অন্য কোনো পন্থা নেই?

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘আমি বেশ জানি যখন শাক্যকুলোদ্ভব পিতা রাজা শুদ্ধোদন হলকর্ষণ-উৎসবে, হলকর্ষণকাজে রত ছিলেন, তখন জামগাছের শীতল ছায়ায় বসে আমি কাম্য বস্তু হতে, অকুশল ধর্ম হতে বিবিক্ত হয়ে সবিতর্ক, সবিচার, বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করে এতে অবস্থান করি। তা কি লক্ষিত বোধিমার্গ হতে পারে না? তখন এই স্মৃতি-অনুযায়ী তাঁর এই জ্ঞান উপস্থিত হয়, এটাই বোধিমার্গ বটে।

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘তবে কি আমি সেই লভ্য সুখের ভয় করছি যা কাম হতে বিচ্ছিন্ন, অকুশল হতে বিচ্ছিন্ন?’ তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘না, আমি সেই সুখের ভয় করছি না, যা কাম হতে বিচ্ছিন্ন, অকুশল হতে বিচ্ছিন্ন।’

তখন তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হয়েছিল, ‘যেহেতু অতিরিক্ত মাত্রায় জীর্ণশীর্ণ দেহে সেই সুখ লাভ করা সুকর নয়, আমি স্থূল-আহার আহার করব, পক্ব ওদন ভোজন করব।’—মহাসিংহনাদ সূত্র, মধ্যমনিকায়

মধ্যপথ অবলম্বন ও পাঁচ শিষ্যের ত্যাগ

অবশেষে তিনি কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার দ্বারা বোধিমার্গ লাভ করা সম্ভব নয়, এই ধারণার বশবর্তী হয়ে যখন গ্রাম-গ্রামান্তর হতে ভিক্ষা সংগ্রহ করে পুষ্টিকর খাদ্য খেতে লাগলেন, তখন তাঁর দেহে বত্রিশ প্রকার মহাপুরুষ লক্ষণগুলো আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় পরিস্ফুট হলো, দেহের রং পুনরায় সোনালি রঙের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

তা দেখে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুরা ভাবতে লাগলেন, ‘শ্রমণ গৌতম দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর তপস্যা করেও সর্বজ্ঞতা লাভ করতে পারলেন না, আর এখন গ্রামে গ্রামে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে পুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে দেহটাকে পরিপুষ্ট করে তিনি কীই-বা করতে পারবেন। বস্তুত তিনি এখন সাধনাভ্রষ্ট হয়ে ভোগবিলাসের দিকে ঝুঁকেছেন। এর কাছে বিশেষ কিছু প্রত্যাশার অর্থ শিশির বিন্দুতে মাথা ধোয়ার প্রচেষ্টারই শামিল। এর দ্বারা আমাদের কীই-বা লাভ হবে।’ এই ভেবে তাঁরা নিজ নিজ পাত্রচীবর নিয়ে সেই মহান পুরুষকে সেখানে একাকী ফেলে চলে গেলেন। চলতে চলতে তাঁরা সেখান হতে আঠারো যোজন পথ অতিক্রম করে ঋষিপতন নামে এক বনসণ্ডে এসে পৌঁছালেন।—অপদান অর্থকথা

সিদ্ধার্থের পাঁচটি স্বপ্ন দর্শন

সিদ্ধার্থ একাকী দৃঢ়চিত্তে উরুবেলায় বুদ্ধত্ব লাভের একনিষ্ঠ সাধনায় নিয়োজিত রইলেন। বৈশাখী পূর্ণিমার শুক্লপক্ষের চতুর্দশী মঙ্গলবার মধ্যরাতে তিনি পাঁচটি মহাস্বপ্ন দেখলেন।

প্রথম স্বপ্নে দেখলেন, সারা বিশ্বটা যেন একটি প্রশস্ত শয্যা। পাঁচশো যোজন বিস্তৃত হিমালয়কে বালিশ হিসেবে মাথায় রেখে তিনি শুয়ে রয়েছেন। বাম হাত পূর্ব সমুদ্রে এবং ডান হাত পশ্চিম সমুদ্রে বিস্তৃত করে পা দুটো দক্ষিণ সমুদ্র সপর্শ করেছে। দ্বিতীয় স্বপ্নে দেখলেন, সাদা রঙের ‘তিরিয়া’ নামে একটি আট ডালবিশিষ্ট গাছ তাঁর হাতের ওপর উৎপন্ন হয়ে বৃদ্ধি পেতে পেতে আকাশ সপর্শ করল। তৃতীয় স্বপ্নে দেখলেন, অসংখ্য কালো মাথাবিশিষ্ট সাদা রঙের উইপোকা তাঁর দুই পা বেয়ে ক্রমে হাঁটু পর্যন্ত আবৃত করল। চতুর্থ স্বপ্নে দেখলেন, চারটি বিভিন্ন রঙের পাখি চারদিক থেকে উড়ে এসে তাঁর পা দুটোর ওপর সজোরে পড়ে সম্পূর্ণ (এক) সাদা রং ধারণ করল। পঞ্চম স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর মনে হলো তিনি বিষ্ঠাপূর্ণ এক প্রকাণ্ড পর্বতে আরোহণ করে চংক্রমণ করছেন, অথচ বিষ্ঠা বা ময়লা তাঁর পায়ে লিপ্ত হচ্ছে না।

এ পাঁচটি মহাস্বপ্ন দেখে এর তাৎপর্য নির্ণয় করতে গিয়ে বুঝতে পারলেন যে, তাঁর বোধিজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ হবার দিন সমাগত। কেননা, প্রথম স্বপ্নের তাৎপর্য হলো-তিনি পূর্ণ বোধিজ্ঞান লাভ করে পরম শান্তি লাভ করবেন এবং আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী তাঁর মহিমা পরিব্যাপ্ত হবে। দ্বিতীয় স্বপ্নের তাৎপর্য হলো : আটটি মার্গ তিনি আবিষ্কার করবেন। তৃতীয় স্বপ্ন আভাস দিচ্ছে, কালোচুলসম্পন্ন সাদা বস্ত্রধারী গৃহীরা তাঁর শরণ নেবেন। চতুর্থ স্বপ্নের তাৎপর্য হলো : ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, এই চার বর্ণের লোক তথাগতের শরণ গ্রহণ করে তাদের ভেদাভেদ ভুলে চরম মুক্তি অর্জন করবে। পঞ্চম স্বপ্নের তাৎপর্য হলো : তিনি তথাগত বুদ্ধরূপে সংসারে বিচরণ করবেন, অথচ সংসারের কলুষতা তাঁকে সপর্শ করবে না। প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি গ্রহণ ও উপভোগ করবেন, অথচ সেই সবের প্রতি তাঁর কোনো আসক্তি থাকবে না। কাজেই তিনি বুঝলেন যে, সেই দিনই তিনি সম্যক সম্বোধি লাভ করে বুদ্ধ হবেন। তিনি মনে অনাবিল প্রশান্তি লাভ করলেন।—মহাস্বপ্ন সূত্র, পঞ্চম-নিপাত, অঙ্গুত্তরনিকায়

সুজাতার পায়েস গ্রহণ

সে সময় উরুবেলায় (বর্তমান গয়ায়) সেনানী নামে এক গ্রাম ছিল। তখন ওই গ্রামের প্রধান শ্রেষ্ঠীর ঘরে সুজাতা নামে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বিবাহযোগ্যা হলে শ্রেষ্ঠীকন্যা সুজাতা এক বিশাল বটগাছের গোড়ায় এই বলে প্রার্থনা করেছিলেন যে, ‘যদি আমি সমমর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের স্বামী লাভ করি এবং আমার প্রথম গর্ভে পুত্রসন্তান লাভ হয়, তা হলে প্রতিবছর লক্ষ মুদ্রা ব্যয়ে আমি তোমাকে অর্ঘ্যদান করব। যথাকালে তাঁর সেই মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছিল।

নিজের মানস অনুসারে সুজাতা সেই মহান পুরুষের সাধনার ষষ্ঠ বছরে পরিপূর্ণ বৈশাখী পূর্ণিমা দিনে পূজা নিবেদনের সিদ্ধান্ত করেছিলেন। এই উদ্দেশ্যে প্রথম হতেই তিনি এক হাজার দুগ্ধবতী গাভিকে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত যষ্টি মধুগাছের বনে চরায়ে আনালেন। পরদিন সেই এক হাজার গাভিকে দোহন করে তা পাঁচশো গাভিকে পান করালেন এবং সেই পাঁচশো গাভির দুধ পুনরায় আড়াইশো গাভিকে পান করালেন। এরূপ দুধের ঘনতা, মধুরতা ও পুষ্টিগুণ বাড়াবার উদ্দেশ্যে ক্রমান্বয়ে গাভি হতে গাভিতে দুধ পরিবর্তনের দ্বারা ষোলোটি গাভির দুধ আটটি গাভিকে পান করানো পর্যন্ত দুধের উপযোগিতা পরীক্ষা করেছিলেন।

শ্রেষ্ঠীকন্যা সুজাতা পবিত্র বৈশাখী পূর্ণিমা দিনের সকালে বনস্পতিকে অর্ঘ্যদানের সংকল্প করে সেদিন অতি ভোরে ঘুম থেকে উঠে সেই আটটি গাভিকে দোহন করালেন। দোহনকালে বাছুরগুলো মাতৃস্তনের কাছেও ঘেঁষল না এবং দোহনের জন্য আনীত নতুন পাত্রগুলো স্তনের নিচে পাত্র রাখামাত্রই দুধের ধারা পড়তে শুরু করল। সেই অলৌকিক ঘটনা দেখে সুজাতা নিজ হাতে দুধ নিয়ে অন্য একটি নতুন পাত্রে ঢেলে নিজে আগুন জ্বেলে পায়েস পাক করতে শুরু করলেন। পাক করার সময় হাতে বড়ো বড়ো বুদ্‌বুদ উঠে বরাবর ডানপাক খেয়ে ঘুরতে লাগল। অথচ বিন্দুমাত্র পায়েসও পাত্র হতে বাইরে পড়ল না, অথবা আগুন হতে সামান্যমাত্র ধোঁয়াও উঠল না।

একই দিনে সুজাতা স্বতঃই প্রকাশিত বহুবিধ আশ্চর্য ব্যাপার দেখে পূর্ণা নামে দাসীকে বললেন, ‘মা পূর্ণা, আজ আমাদের দেবতা অত্যন্ত প্রসন্ন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এতকাল যাবৎ আমরা এরূপ আশ্চর্য ঘটনা আর কোনো দিন দেখিনি। তুমি যাও শিগগিরই পূজার বেদিটা পরিষ্কার করে এসো।’ তাঁর আদেশে দাসী শিগগিরই গাছতলায় গেল।

এরপর পূর্ণা দাসী সেখানে গিয়ে দেখল, পূর্বদিক উদ্ভাসিত করে সিদ্ধার্থ গাছের গোড়ায় বসে আছেন। তাঁর দেহনিঃসৃত রশ্মিচ্ছটায় গাছটির আগাগোড়া সোনার মতো উজ্জ্বল দেখে পূর্ণা চিন্তা করল, ‘আজ আমাদের দেবতা নিজ হাতে পূজা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে গাছ হতে নেমে গোড়াতেই বসে আছেন।’ এই ভেবে উৎফুল্ল চিত্তে সেখান হতে শিগগিরই ফিরে শ্রেষ্ঠীকন্যাকে এই শুভসংবাদ জানাল। এই খবরে সুজাতা খুব খুশি হয়ে পূর্ণা দাসীকে নিজের কন্যার মতো উপযুক্ত অলংকারে সাজিয়ে বলল, ‘মা পূর্ণা, আজ হতে তুমি আমার জ্যেষ্ঠা কন্যার পদে প্রতিষ্ঠিতা হলে।’

সেদিন শ্রেষ্ঠীকন্যা সুজাতার মনেও সোনার পাত্রে পূজা দেওয়ার ইচ্ছা উৎপন্ন হলো। অতএব, তিনি লক্ষ মুদ্রা মূল্যের একটি সোনার পাত্র বের করালেন এবং পায়েস তাতে ঢেলে নেবার ইচ্ছায় মূল পায়েসপাত্রটি যখনই উপুড় করলেন, তখন পদ্মপাতা হতে জলবিন্দু পড়ার মতো সব পায়েস নিঃশেষে সোনার পাত্রে পড়ল। পাত্রটি পায়সে পরিপূর্ণ হলো। তখন শ্রেষ্ঠীকন্যা ওই পাত্রটিকে অপর একটি সোনা লাগানো ঢাকনার দ্বারা ঢেকে তা আবার কাপড়ের দ্বারা আচ্ছাদিত করলেন। তারপর সর্বাভরণে নিজেও সেজেগুজে পায়েসপূর্ণ পাত্রটি নিজে মাথায় বহন করে অত্যন্ত আড়ম্বর-সহকারে সেই অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় এলেন। শ্রেষ্ঠীকন্যা গাছের গোড়ায় বসা সিদ্ধার্থকে দেখামাত্রই বৃক্ষদেবতা মনে করে বিপুল আনন্দে শ্রদ্ধানতা মাথায় বন্দনা করতে করতে এগিয়ে আসলেন। পরে মাথা হতে সোনার পাত্রটি মাটিতে রেখে ঢাকনা খুললেন এবং সুবর্ণভৃঙ্গারে সুবাসিত পানীয় জল নিয়ে শ্রেষ্ঠীকন্যা সুজাতা সিদ্ধার্থের সামনে দান দেওয়ার ভঙ্গিতে প্রণতা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

এরপর সেই মহান পুরুষ যখন শ্রেষ্ঠীকন্যার দিকে তাকালেন তখন তিনি সিদ্ধার্থকে পাত্রসহ মধুর পায়েস হাতে তুলে দিলেন। সশ্রদ্ধ বন্দনা করে বিনম্র বাক্যে বললেন, ‘দেব, পাত্রসহ এই পায়েস ও সুগন্ধি পানীয় আপনাকে দান করলাম। এই দান গ্রহণ করে আপনি যথা ইচ্ছা যেতে পারেন। আজ আমার যেমন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে, সেরূপ এই নির্জলা পায়েস খেয়ে আপনার মনস্কামনাও সিদ্ধ হোক।’ এই প্রার্থনা করে শ্রেষ্ঠীকন্যা লক্ষ মুদ্রা মূল্যের সেই সোনার পাত্রটি পুরোনো মাটির পাত্রের মতোই পরিত্যাগ করে নিরাসক্ত চিত্তে চলে গেলেন।—অপদান অর্থকথা

নৈরঞ্জনা নদীর তীরে পায়েস ভোজন

সিদ্ধার্থ সেই বসার জায়গা থেকে উঠে গিয়ে গাছটিকে প্রদক্ষিণ করে স্বর্ণপাত্রসহ নৈরঞ্জনা নদীর তীরে গেলেন। নৈরঞ্জনা নদীতে লক্ষ লক্ষ বোধিসত্ত্ব সম্বোধি লাভের দিনে সেখানে নেমে স্নান করতেন। সেই স্নানের জায়গাটাকে সুপ্রতিষ্ঠিত নামক তীর্থ বলা হয়। সেখানে নদীর তীরে পাত্রটি রেখে সুপ্রতিষ্ঠিত তীর্থে নেমে স্নান করে লক্ষ লক্ষ বুদ্ধের পোশাক সেই অর্হত্ত্বের নিশান পরিধান করলেন। এরপরে পূর্বদিকে মুখ করে বসে পাকা তালের একটি আঁটি বা শাঁসের মতো বড় করে উনপঞ্চাশ গ্রাস করে সবটুকু মধুপায়েস ভোজন করলেন। সেটা ছিল বুদ্ধ হয়ে সাত সপ্তাহ বোধিমণ্ডপে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উনপঞ্চাশ দিনের আহার। এতদিন তাঁর অন্য কোনো আহার ছিল না। স্নান, মুখ ধোয়া, পায়খানা-প্রস্রাব কিছুই ছিল না। ধ্যানসুখ এবং ফলসমাপত্তি সুখে দিন কেটে গিয়েছিল।

সেই পায়েস খেয়ে স্বর্ণপাত্র নিয়ে সিদ্ধার্থ ‘আজ যদি বুদ্ধ হই, তা হলে এই পাত্র স্রোতের প্রতিকূলে চলুক, না হলে স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাক’ এই বলে নদীতে সেই পাত্র নিক্ষেপ করলেন। পাত্রটি স্রোত ছিন্ন করে নদীর মধ্যে গিয়ে সেখান থেকে দ্রুতগামী ঘোড়ার মতো আশি হাত উজানে গিয়ে একটা আবর্তে ডুবে গেল। ডুবে গিয়ে সেটা কাল নামক নাগরাজার ভবনে গিয়ে তিনটি বুদ্ধের ব্যবহৃত পাত্রগুলোর সঙ্গে ‘কিলি কিলি’ শব্দে ধাক্কা খেয়ে তাদের সবচেয়ে নিচে গিয়ে স্থিত হলো। কাল নাগরাজা সেই শব্দ শুনে ‘গতকাল এক বুদ্ধ জন্মালেন, আজ আরেক এক বুদ্ধ জন্মেছেন’ এই বলে অনেক শতপদী গাথায় গুণকীর্তন করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন। তার নাকি মহাপৃথিবী এক যোজন তিন গাবুত পরিমাণ ওপরের দিকে বৃদ্ধির সময়টা আজ অথবা কালকের কথা বলে মনে হতো।

বোধিসত্ত্বও নদীর তীরে কুলে কুলে সুশোভিত শালবনে দিন কাটিয়ে সন্ধ্যাবেলায় ফুলগাছের বৃন্তচ্যুত হয়ে ঝরে পড়ার সময়ে দেবতাগণের দ্বারা অলংকৃত অষ্ট উসভ বিস্তৃত পথ ধরে সিংহের নির্ভীক পথ চলার মতো করে বোধিবৃক্ষের দিকে রওনা হলেন। নাগ, যক্ষ, সুপর্ণরা দিব্য সুগন্ধি ফুলে তাঁকে পূজা করতে লাগল। দিব্য সংগীত বাজতে লাগল, দশ হাজার লোকধাতু একগন্ধ, একমালা, এক সাধুবাদ প্রদানকারী হলো।—বুদ্ধবংশ অর্থকথা

বোধিমণ্ডপে আসন গ্রহণ

সেই সময়ে সোত্থিয়ো নামে এক ঘাস সংগ্রহকারী ঘাস নিয়ে সেই পথে আসছিল। সিদ্ধার্থের মুখোমুখি হয়ে তাঁকে সে আট মুঠো ঘাস দিল। সিদ্ধার্থ ঘাসগুলো নিয়ে বোধিমণ্ডপে উঠে দক্ষিণভাগে উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তখন দক্ষিণ চক্রবাল নিচে নেমে গিয়ে অবীচি নরকে ঠেকে গেছে বলে মনে হলো। ‘এটি সম্বোধি লাভের স্থান হবে না বলে মনে হচ্ছে’ এই বলে সিদ্ধার্থ প্রদক্ষিণ করতে করতে পশ্চিমভাগে গিয়ে পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে পশ্চিম চক্রবাল নেমে গিয়ে অবীচি নরকে ঠেকে গেছে বলে মনে হলো। পূর্ব চক্রবাল ওপরে ভবাগ্র পর্যন্ত উঠে গেছে বলে মনে হলো। সেই দাঁড়ানোর স্থানে নাকি মহা শকটের চাকার মতো কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত এই মহাপৃথিবীটা উঁচুনিচু হয়েছিল। সিদ্ধার্থ ‘এটাও সম্বোধি লাভের স্থান হবে না বলে মনে হচ্ছে’ এই বলে প্রদক্ষিণ করতে করতে উত্তরভাগে গিয়ে দক্ষিণ দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে উত্তর চক্রবাল নেমে গিয়ে অবীচিতে পৌঁছে গেছে বলে মনে হলো, দক্ষিণ চক্রবাল উঠে গিয়ে ভবাগ্রে পৌঁছে গেছে বলে মনে হলো। সিদ্ধার্থ ‘এটাও সম্বোধি লাভের স্থান হবে না বলে মনে হচ্ছে’ এই বলে প্রদক্ষিণ করতে করতে পূর্বভাগে গিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। পূর্বভাগে সব বুদ্ধের বোধিপালঙ্কের স্থান ছিল, সেটা তাই ভীত হলো না, কেঁপে উঠল না। সিদ্ধার্থ ‘এটি সব বুদ্ধের অপরিত্যাজ্য নিশ্চল স্থান, ক্লেশের খাঁচা ছিন্নভিন্ন করার স্থান’ এই জেনে সেই ঘাসগুলো নিয়ে বিছিয়ে দিলেন। তাতে চৌদ্দ হাত বিস্তৃত পালঙ্ক হয়ে গেল। সেই ঘাসগুলোও এমনভাবে বিছানা হয়ে গেল, যা কোনো দক্ষ চিত্রকর বা লেখকও প্রকাশ করতে সমর্থ নয়। সিদ্ধার্থ বোধিবৃক্ষের কাণ্ডকে পিঠ দিয়ে পূর্বদিকে মুখ করে দৃঢ়চেতা হয়ে বললেন :

এ আসনে দেহ মোর যাক শুকাইয়া

চর্ম-অস্থি-মাংস যাক প্রলয়ে ডুবিয়া।

না লভিয়া বোধিজ্ঞান দুর্লভ জগতে

টলিবে না দেহ মোর এ আসন হতে।

‘সম্যক সম্বোধি প্রাপ্ত না হয়ে এই আসন থেকে উঠব না’ এভাবে বজ্রকঠিন সংকল্প নিয়ে অপরাজিত বোধিপালঙ্কে পদ্মাসনে বসলেন।—অপদান অর্থকথা

বোধিদ্রুমমূলে মারের সঙ্গে যুদ্ধ ও বিজয়

সেই সময়ে পাপী মার ভাবল, ‘সিদ্ধার্থ কুমার আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে ইচ্ছুক, তাঁকে এভাবে আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে দেবো না।’ এই ভেবে মারসেনাদের কাছে গিয়ে তাদের ব্যাপারটা জানিয়ে মারঘোষণা নামে ঘোষণা দিয়ে সসৈন্যে বের হলো। সেই মারসেনারা মারের সামনে বারো যোজন বিস্তৃত ছিল। সেভাবে ডানে, বামেও বারো যোজন বিস্তৃত ছিল। পেছনে চক্রবালের সীমানা পর্যন্ত দাঁড়াল। ওপরে নয় যোজন উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাদের গর্জনের শব্দ শুনে হাজার যোজন দূর থেকেও মনে হতো পৃথিবী বুঝি ভেঙেচুরে যাচ্ছে। সেখানে মার দেবপুত্র দেড়শো যোজন দীর্ঘ গিরিমেঘলা নামের হাতির ওপর উঠে হাজার বাহু নির্মাণ করে তাতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণ করল। অবশিষ্ট মারপরিষদও দুজনে এক ধরনের অস্ত্র নিল না। নানান বর্ণ ধারণ করে, নানান মুখাকৃতি হয়ে, নানান অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা সিদ্ধার্থকে পরাজিত করার জন্য এগিয়ে গেল। এদিকে দশ হাজার চক্রবালের দেবতারা সিদ্ধার্থের প্রশংসাগীতি করতে করতে সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। দেবরাজ শক্র বিজয়োত্তর শঙ্খ বাজাচ্ছিলেন। সেই শঙ্খ নাকি দুই হাজার হাত লম্বা। তাতে ফুঁ দিয়ে বাজাতে থাকলে চার মাস ধরে শব্দ করে তবেই নিঃশব্দ হয়। মহাকাল নাগরাজ শত শত প্রশংসাগীতি করতে করতে দাঁড়িয়েছিলেন। মহাব্রহ্মা সাদা ছাতা ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু মারসেনা বোধিমণ্ডপে এসে উপস্থিত হলে তাঁদের একজনও সেখানে দাঁড়াতে পারলেন না। যে যেদিকে পারেন পালিয়ে গেলেন। কাল নাগরাজ পৃথিবীতে ডুব দিয়ে পাঁচশো যোজন বিস্তৃত প্রস্ফুটিত নাগভবনে গিয়ে উভয় হাতে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়লেন। দেবরাজ শক্র বিজয়োত্তর শঙ্খ পিঠে বহন করে নিয়ে চক্রবালের প্রান্তসীমায় গিয়ে দাঁড়ালেন। মহাব্রহ্মা সাদা ছাতার একপ্রান্তে ধরে ব্রহ্মলোকে চলে গেলেন। একজন দেবতাও সেখানে থাকতে সমর্থ হলেন না। সিদ্ধার্থ একাই বসে রইলেন।

মার নিজের পরিষদকে বলল, ‘বাপুরা, শুদ্ধোদনের পুত্র সিদ্ধার্থের মতো পুরুষ আর নেই। আমরা সম্মুখ যুদ্ধ করতে পারব না, পেছন দিকে যুদ্ধ করব।’ সিদ্ধার্থ তাঁর তিন পাশে দেখে নিয়ে সব দেবতা পালিয়ে যাওয়াতে সেদিকে সব শূন্য দেখলেন। আবার উত্তর পাশ থেকে মারসেনারা অগ্রসর হচ্ছে দেখে, ‘এই এতগুলো লোক আমার একার উদ্দেশেই এত বড়ো প্রচেষ্টা করছে। এখানে আমার মা-বাবা, ভাই অথবা অন্য কোনো জ্ঞাতি নেই, কিন্তু আমার এই দশ পারমী হচ্ছে আমার দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপালিত আত্মীয়স্বজনের মতো। সে-কারণে পারমীগুলোকে সামনে রেখে পারমী-অস্ত্রের দ্বারা আঘাত করেই এই সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করতে হবে।’ এই ভেবে দশ পারমী পর্যালোচনা করে করে বসে রইলেন।

তখন মার দেবপুত্র ‘বাতাসের তোড়ে সিদ্ধার্থকে তাড়াব’ এই ভেবে ঘূর্ণিবায়ু সৃষ্টি করল। সেই মুহূর্তে চারদিক থেকে প্রবল বাতাস উঠল। তা আধা যোজন, এক যোজন, দুই যোজন, তিন যোজন বিস্তৃত পর্বতশৃঙ্গগুলো উড়িয়ে নিয়ে, বন-বনানী গাছপালা শেকড়সহ উপড়ে ফেলে, সব গ্রাম-শহর চূর্ণবিচূর্ণ করতে সমর্থ ছিল। কিন্তু সিদ্ধার্থের পুণ্যতেজে তা শক্তিহীন হয়ে সিদ্ধার্থের কাছে এসে তাঁর চীবরের কোনাও নাড়াতে পারল না। তারপর ‘তাঁকে পানিতে ডুবিয়ে মারব’ এই ভেবে মহাবৃষ্টি সৃষ্টি করল। মারের প্রভাবে শত মেঘপুঞ্জ, হাজার মেঘপুঞ্জ উঠে বর্ষণ শুরু করল। বন ও গাছপালার ওপরে মহামেঘ এসেও সিদ্ধার্থের চীবরে শিশিরবিন্দুর মতোও ভেজাতে পারল না। এরপর শুরু করল শিলাবৃষ্টি। বিরাট বিরাট পর্বতচূড়া জ্বলতে জ্বলতে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশে উঠে গিয়ে সিদ্ধার্থের কাছে এসে দিব্যমালার গুটির মতো এসে পড়ল। এরপর শুরু হলো অস্ত্রবৃষ্টি। একদিকে ধারালো, উভয়দিকে ধারালো তলোয়ার, বল্লম, ক্ষুর ইত্যাদি ধোঁয়া বের করতে করতে জ্বলতে জ্বলতে আকাশ থেকে সিদ্ধার্থের কাছে এসে দিব্যপুষ্প হয়ে গেল। এরপর অঙ্গারবৃষ্টি শুরু করল। লালরঙা অঙ্গার আকাশ থেকে গিয়ে সিদ্ধার্থের পায়ের কাছে পড়ে দিব্যফুল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। এরপর ছাইবৃষ্টি শুরু হলো। ভীষণ তপ্ত, আগুনরঙা ছাই আকাশ থেকে সিদ্ধার্থের পায়ের কাছে চন্দনচূর্ণ হয়ে পড়ে গেল। এরপর বালুবৃষ্টি শুরু করল। মিহি বালুরাশি ধোঁয়া বের করতে করতে, জ্বলতে জ্বলতে আকাশ থেকে গিয়ে সিদ্ধার্থের পায়ের কাছে দিব্যপুষ্প হয়ে পড়ে গেল। এরপর কাদাবৃষ্টি শুরু করল। সেই কাদা ধোঁয়া বের করতে করতে, জ্বলতে জ্বলতে আকাশ থেকে সিদ্ধার্থের পায়ের কাছে গিয়ে দিব্য সুগন্ধি প্রলেপের মতো হয়ে পড়ে গেল। এরপর ‘ভয় দেখিয়ে সিদ্ধার্থকে তাড়াব’ এই ভেবে অন্ধকার সৃষ্টি করল। তা চারটি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আঁধারের মতো মহা আঁধার হয়ে সিদ্ধার্থের কাছে এসে সূর্যালোক উপস্থিত হওয়ার মতো সেই অন্ধকার দূরীভূত হলো।

এভাবে মার বায়ু-জল-শিলা-অস্ত্র-অঙ্গার-ছাই-বালু-কাদা-অন্ধকার দিয়ে নয় প্রকারে আক্রমণ করেও সিদ্ধার্থকে তাড়াতে না পেরে নিজের পরিষদকে আদেশ দিল, ‘কী হে! দাঁড়িয়ে আছ কেন? এই সিদ্ধার্থ কুমারকে ধরো, মারো, তাড়াও।’ এই বলে নিজেও গিরিমেখলা হাতির পিঠে বসে চক্রায়ুধ নিয়ে সিদ্ধার্থের কাছে গিয়ে বলল, ‘সিদ্ধার্থ, ওই আসন থেকে ওঠো। সেটা তোমার প্রাপ্য নয়। সেটা আমারই প্রাপ্য।’ সিদ্ধার্থ তার কথা শুনে জবাব দিলেন, ‘মার, তুমি দশ পারমী, দশ উপপারমী, দশ পরমার্থপারমী কোনোটাই পূরণ করোনি। তুমি পঞ্চ মহাপরিত্যাগ পরিত্যাগ করনি, তুমি জ্ঞাতিচর্যা, লোকচর্যা, বুদ্ধচর্যা পূরণ করোনি, এগুলো সবই আমার দ্বারা পূরিত হয়েছে। তাই এই আসন তোমার প্রাপ্য নয়, এই আসন আমারই প্রাপ্য।’

মার তখন প্রচণ্ড রেগেমেগে নিজেকে সামলাতে না পেরে সিদ্ধার্থের দিকে চক্রায়ুধ নিক্ষেপ করল। সেটা দশ পারমী পর্যালোচনারত সিদ্ধার্থের ওপরে মালার মতো হয়ে থাকল। সেই ক্ষুরধার চক্রায়ুধ অন্য কোথাও নিক্ষেপ করলে তা ঘন শিলাস্তম্ভকেও কচি বাঁশের মতো ভেদ করে যেত। কিন্তু এখন সেই আয়ুধ মালার সামিয়ানার মতো বোধিসত্ত্বের মাথার ওপর শোভা বর্ধন করল। তখন মারপরিষদ ‘এখনই সিদ্ধার্থ আসন থেকে উঠে পালাবে’ এই বলে বিরাট বিরাট পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করল। সেগুলোও দশ পারমী পর্যালোচনারত সিদ্ধার্থের মালার গুটির মতো হয়ে ভূমিতে পড়ল। দেবতারা চক্রবালের কিনারায় দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে, মাথা তুলে দেখে বলতে লাগল, ‘হায় রে! সিদ্ধার্থ কুমারের এমন অনিন্দ্যসুন্দর দেহ বিনষ্ট হলো, কী করবে সে এখন?’

এরপর সিদ্ধার্থ ‘সম্বোধি লাভের দিনে এই পালঙ্ক আমারই প্রাপ্য’ এই বলে দাঁড়িয়ে থাকা মারকে বললেন, ‘মার, তোমার দানের সাক্ষী কে?’ মার তখন ‘এই এতজন আমার সাক্ষী’ বলে হাত বাড়িয়ে তার সেনাদের দেখিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে মারপরিষদ ‘আমি সাক্ষী, আমি সাক্ষী’ বলে যে শব্দ করল তা পৃথিবী ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার শব্দের মতো হলো। এরপর মার সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞেস করল, ‘সিদ্ধার্থ, তোমার দানের সাক্ষী কে?’ সিদ্ধার্থ তখন বললেন, ‘তোমার সেই দানের সচেতন সাক্ষী আছে কিন্তু এখানে আমার সচেতন কোনো সাক্ষী নেই। আমার অবশিষ্ট জন্মগুলোতে দেয়া দানগুলোর কথা থাকুক, এক বেস্সন্তর জন্মেই আমার সাতশো মহাদানের সময় এই অচেতন মহাপৃথিবী সাক্ষী আছে।’ এই বলে চীবরের অভ্যন্তর থেকে ডান হাত বের করে ‘বেস্সন্তর জন্মে আমার সাতশো মহাদানের তুমি সাক্ষী আছ, নাকি নেই?’ এই বলে মহাপৃথিবীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। মহাপৃথিবী ‘আমি আপনার সেই তখনকার সাক্ষী’ এই বলে শত গর্জন, হাজারও গর্জন, লক্ষ গর্জনে মারসেনাকে ছত্রভঙ্গ করে পরাজিত করার মতো করে গর্জে উঠল।

তখন মহাপুরুষ ‘সিদ্ধার্থ আপনি মহাদান দিয়েছেন, উত্তম দানই দিয়েছেন’ এই বলে বেস্সন্তর দান পর্যালোচনায় রত হলেন। এদিকে দেড়শো যোজন বিস্তৃত গিরিমেখলা হাতি হাঁটুতে ভর দিয়ে পৃথিবীতে দাঁড়ানো, মারপরিষদ দিগ্‌বিদিক পালিয়ে গেল, দুজন একপথে গেল না, মাথার সাজসজ্জা ও পরনের পোশাক ফেলে যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল। তখন দেবসংঘ পলায়নরত মারসেনাদের দেখে ‘মারের পরাজয় হয়েছে, সিদ্ধার্থ কুমারের জয় হয়েছে, আমরা জয়পূজা করব’ এই বলে দেবতা দেবতাদের, নাগ নাগগণকে, সুপর্ণরা সুপর্ণগণকে, ব্রহ্মারা ব্রহ্মাগণকে ঘোষণা করে দিয়ে সুগন্ধি মালা ইত্যাদি হাতে সিদ্ধার্থের কাছে বোধিপালঙ্কে এসে উপস্থিত হলেন।

তাদের মধ্যে ‘এটা শ্রীমান বুদ্ধেরই জয়, পাপী মারের পরাজয়’ এভাবে বোধিমণ্ডপে উৎফুল্ল দেবগণ মহর্ষির জয় ঘোষণা করেছিলেন।’

‘এটা শ্রীমান বুদ্ধেরই জয়, পাপী মারের পরাজয়’ এভাবে বোধিমণ্ডপে উৎফুল্ল নাগগণ মহর্ষির জয় ঘোষণা করেছিলেন।

এটা শ্রীমান বুদ্ধেরই জয়, পাপী মারের পরাজয়-এভাবে বোধিমণ্ডপে উৎফুল্ল সুপর্ণসংঘ মহর্ষির জয় ঘোষণা করেছিলেন। ‘এটা শ্রীমান বুদ্ধেরই জয়, পাপী মারের পরাজয়’ এভাবে বোধিমণ্ডপে উৎফুল্ল ব্রহ্মাগণ মহর্ষির জয় ঘোষণা করেছিলেন। দশ হাজার চক্রবালের বাদবাকি দেবতারা মালা-সুগন্ধি-প্রলেপ ইত্যাদি দিয়ে পূজা করতে করতে নানাপ্রকারে প্রশংসাগীতি করতে করতে দাঁড়িয়েছিলেন। এভাবে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই মহাপুরুষ মারসেনাকে পরাজিত করেছিলেন। তখন চীবরের ওপরে বোধিবৃক্ষের অঙ্কুর রক্তপ্রবালের মতো হয়ে ঝরে পড়ে পূজা করছিল।—অপদান অর্থকথা

বুদ্ধত্ব লাভ

সিদ্ধার্থ বাহ্যিক সব মারসেনা পরাভূত করে তিনি কাম্য বস্তু হতে সম্পর্কহীন হয়ে, অকুশল হতে সম্পর্কহীন হয়ে, সবিতর্ক, সবিচার, বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করে তাতে অবস্থান করেন। বিতর্কবিচার-উপশমে অধ্যাত্মসম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব-আনয়নকারী, বিতর্কাতীত, বিচারাতীত, সমাধিজ প্রীতিসুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে তাতে বিচরণ করেন। সে প্রীতির প্রতিও উদাসীন হয়ে উপেক্ষাশীল হয়ে অবস্থান করেন এবং স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হয়ে কায়িক সুখ অনুভব করেন; যে অবস্থায় থাকলে আর্যগণ ‘উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী’ বলে অভিহিত করেন সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করেন। সকল সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করে, আগেই মানসিক সুখ-দুঃখের বিনাশ সাধন করে, সুখ-দুঃখহীন ‘উপেক্ষা স্মৃতি পরিশুদ্ধি’ নামে চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করেন।

তিনি সর্বতোভাবে রূপসংজ্ঞাগুলো অতিক্রম করে প্রতিঘসংজ্ঞা ধ্বংস করে নানাত্বসংজ্ঞায় অমনোযোগী হয়ে ‘অনন্ত আকাশ’ সংজ্ঞায় আকাশ-অনন্তায়তন লাভ করে অবস্থান করেন। তিনি সম্পূর্ণরূপে আকাশ-অনন্তায়তন অতিক্রম করে ‘অনন্ত বিজ্ঞান’ সংজ্ঞায় বিজ্ঞান-অনন্তায়তন লাভ করে অবস্থান করেন। সর্বতোভাবে বিজ্ঞান-অনন্তায়তন অতিক্রম করে সংজ্ঞায় বিজ্ঞান-অনন্তায়তন লাভ করে অবস্থান করেন। সর্বতোভাবে বিজ্ঞান-অনন্তায়তন অতিক্রম করে ‘কিছুই নেই’ সংজ্ঞায় আকিঞ্চনায়তন লাভ করে অবস্থান করেন। এবং সর্বতোভাবে আকিঞ্চনায়তন অতিক্রম করে নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞায়তন লাভ করে অবস্থান করেন।

এরপর সিদ্ধার্থ এমন সমাহিত চিত্ত নিয়ে পরিশুদ্ধ, বিশুদ্ধ, পরিষ্কার, নিখাদ, উশক্লেশ-বিগত, কোমল, কাজের উপযোগী, স্থির ও শান্ত অবস্থায় অবিচল প্রাপ্ত হয়ে আগের জন্মগুলোর স্মৃতি জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে পরিচালিত করেন, নমিত করেন। সেই অবস্থায় তিনি নানাপ্রকারে বহু পূর্বজন্ম স্মরণ করেন, এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, এমনকি শতসহস্র জন্ম, বহু প্রলয়কল্পে, বহু সৃষ্টিকল্পে, এমনকি বহু প্রলয়-সৃষ্টিকল্পে, সেখানে আমি ছিলাম, এই ছিল আমার নাম, এই আমার গোত্র, এই আমার জাতিবর্ণ, এই আমার আহার, এমন আমার সুখদুঃখ-অনুভব, এই আমার পরমায়ু, তা হতে চ্যুত হয়ে আমি এখানে (এই যোনিতে) উৎপন্ন হই, সেখানে ছিল আমার এই নাম, এই গোত্র, এই জাতিবর্ণ, এই আহার, এমন সুখদুঃখ-অনুভব, এই পরমায়ু; সেখান হতে চ্যুত হয়ে আমি এখানে (এই যোনিতে) উৎপন্ন হয়েছি। এমন আকার ও উদ্দেশ, স্বরূপ ও গতিসহ নানাপ্রকারে বহু পূর্বজন্মগুলোকে স্মরণ করেন। অপ্রমত্ত, আতাপী (বীর্যবান) ও সাধনাতৎপর হলে যেমন যেমন হয়, রাতের প্রথম যামে তেমনভাবেই তাঁর এই প্রথম বিদ্যা জাতিস্মর-জ্ঞান অধিগত হয়, অবিদ্যা বিহত, বিদ্যা উৎপন্ন, অন্ধকার ধ্বংস, আলোক উৎপন্ন হয়।

তিনি এমন সমাহিত চিত্ত নিয়ে পরিশুদ্ধ, বিশুদ্ধ, পরিষ্কার, নিখাদ, উশক্লেশ-বিগত, কোমল, কাজের উপযোগী, স্থির ও শান্ত অবস্থায় অবিচল প্রাপ্ত হয়ে সত্ত্বদের চ্যুতি-উৎপত্তি জ্ঞানের জন্য চিত্তকে পরিচালিত করেন, নমিত করেন। তিনি মনুষ্যদৃষ্টির অতিক্রান্ত বিশুদ্ধ দিব্য চোখ দ্বারা চ্যুত ও উৎপন্ন হতে থাকা সত্ত্বগণকে হীন, উত্তম, সুশ্রী, বিশ্রী, সুগতি ও দুর্গতিতে যেতে দেখেন। তিনি সেই সত্ত্বগণের যার যার কর্ম অনুযায়ী গতিকে প্রকৃতভাবে জানেন, ‘এই সত্ত্ব মহাশয়গণ দৈহিক দুরাচারসমন্বিত, বাচনিক দুরাচারসমন্বিত, মানসিক দুরাচারসমন্বিত, আর্যগণকে নিন্দাকারী মিথ্যাদৃষ্টিভঙ্গি-সম্পন্ন, মিথ্যাদৃষ্টিভঙ্গি-ভিত্তিক কর্ম সম্পাদনকারী। তারা দেহত্যাগ করে মরণের পর অপায় দুর্গতিতে দুঃখময় অবস্থায় নরকে উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু এই সত্ত্ব মহাশয়গণ দৈহিক সদাচারসমন্বিত, বাচনিক সদাচারসমন্বিত, মানসিক সদাচারসমন্বিত, আর্যগণকে নিন্দাকারী নয় এবং সম্যক দৃষ্টিভঙ্গি-সম্পন্ন, সম্যক দৃষ্টিভঙ্গি-ভিত্তিক কর্ম সম্পাদনকারী। তারা দেহত্যাগে মরণের পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়েছে।’ এভাবে সে মনুষ্যদৃষ্টির অতিক্রান্ত বিশুদ্ধ দিব্য চোখ দ্বারা চ্যুত ও উৎপন্ন হতে থাকা সত্ত্বগণকে হীন, উত্তম, সুশ্রী, বিশ্রী, সুগতি ও দুর্গতিতে যেতে দেখেন। তিনি তাদের যার যার কর্ম অনুযায়ী গতিকে প্রকৃতভাবে জানেন।

তখন ভগবান রাতের শেষ যামে প্রতীত্যসমুৎপাদ (পটিচ্চসমুপ্পাদ) ধর্মে সুন্দরভাবে অনুলোম ও প্রতিলোম ভাবনানুক্রমে মনোনিবেশ করলেন, ‘যদি এটা থাকে তবে এটা হয়, এর উৎপত্তিতে এর উৎপত্তি হয়। যদি এটা না থাকে তবে এটাও হয় না, এর নিরোধে এরও নিরোধ হয়; যথা : অবিদ্যার কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নামরূপ, নামরূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জন্ম, জন্মের কারণে জরা, মৃত্যু, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও হা-হুতাশের উৎপত্তি হয়। এভাবেই সম্পূর্ণ দুঃখরাশির সমুদয় হয়ে থাকে।’

‘অবিদ্যারই অশেষ বিরাগ ও নিরোধে সংস্কারের নিরোধ, সংস্কারের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ, ভবের নিরোধে জন্মের নিরোধ, জন্মের নিরোধে জরা, মৃত্যু, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও হা-হুতাশের নিরোধ হয়।’

তিনি এমন সমাহিত চিত্ত নিয়ে পরিশুদ্ধ, বিশুদ্ধ, পরিষ্কার, নিখাদ, উশক্লেশ-বিগত, কোমল, কাজের উপযোগী, স্থির ও শান্ত অবস্থায় অবিচল প্রাপ্ত হয়ে আস্রবক্ষয়-জ্ঞানাভিমুখে তাঁর চিত্ত নমিত করেন। তদবস্থায় উন্নত জ্ঞানে যথার্থ জানতে পারেন-এটা দুঃখ, এটা দুঃখসমুদয়, এটা দুঃখনিরোধ, এটা দুঃখনিরোধগামী প্রতিপদ; এসব আস্রব, এটা আস্রবসমুদয়, এটা আস্রবনিরোধ, এটা আস্রবনিরোধগামী প্রতিপদ। তদবস্থায় এভাবে আর্যসত্য জানার এবং দেখার ফলে কামাস্রব হতে তাঁর চিত্ত বিমুক্ত হয়, ভবাস্রব হতে তাঁর চিত্ত বিমুক্ত হয়, অবিদ্যাস্রব হতেও তাঁর চিত্ত বিমুক্ত হয়, বিমুক্ত হলে ‘বিমুক্ত হয়েছি’ এই জ্ঞান উদয় হয়, উন্নত জ্ঞানে জানতে পারেন-চিরতরে জন্মবীজ ক্ষীণ হয়েছে, ব্রহ্মচর্যব্রত উদ্‌যাপিত হয়েছে, করণীয় কাজ কৃত হয়েছে, এরপর এখানে আর আসতে হবে না।—মহাসত্যক সূত্র, মধ্যমনিকায়

তখন সিদ্ধার্থ সূর্যোদয়ের সময়ে দশ হাজার লোকধাতু সশব্দে কাঁপিয়ে সর্বজ্ঞতা জ্ঞান প্রাপ্ত হলেন। এ সময় দশ হাজার লোকধাতু সব অলংকৃত হয়ে উঠল। পূর্ব চক্রবালের মুখের প্রারম্ভে স্থাপিত ধ্বজাগুলোর পতাকা পশ্চিম চক্রবালের মুখের প্রারম্ভ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। একইভাবে পশ্চিম চক্রবালের মুখের প্রারম্ভে স্থাপিত ধ্বজাগুলোর পতাকা পূর্ব চক্রবালের মুখের প্রারম্ভ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। দক্ষিণ চক্রবালের মুখের প্রারম্ভে স্থাপিত ধ্বজাগুলোর পতাকা উত্তর চক্রবালের মুখের প্রারম্ভ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, উত্তর চক্রবালের মুখের প্রারম্ভে স্থাপিত ধ্বজাগুলোর পতাকা দক্ষিণ চক্রবালের মুখের প্রারম্ভ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। পৃথিবীপৃষ্ঠে স্থাপিত ধ্বজাগুলোর পতাকা ব্রহ্মলোক পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছিল। ব্রহ্মলোকে স্থাপিত ধ্বজাগুলোর পতাকা পৃথিবীপৃষ্ঠে এসে ঠেকেছিল। দশ হাজার চক্রবালে ফুলের গাছগুলোতে ফুল ফুটেছিল অগণিত। ফুলগাছগুলোতে ফল ধরেছিল রাশি রাশি। পদ্মের ওপরে পদ্ম ফুটেছিল। ঘন পাথর ভেদ করে উপর্যুপরি শত পাতার ওপরে দণ্ডপদ্ম ফুটেছিল। দশ হাজার লোকধাতু ছড়ানো-ছিটানো মালার গুটির মতো, ফুলের আস্তরণের মতো ফুল ছড়িয়েছিল। চক্রবালগুলোর মাঝে যে আট হাজার যোজন বিস্তৃত লোকান্তরিক নরকগুলো আছে, যেগুলো সাতটি সূর্যের আলোতেও আলোকিত হতো না, সেগুলো এক আলোকে আলোকিত হয়েছিল। চুরাশি হাজার যোজন গভীর মহাসমুদ্রের পানি মিষ্টি স্বাদের হয়েছিল; নদীগুলোর বয়ে যাওয়া থেমে গিয়েছিল, জন্মান্ধরা চোখে দেখেছিল, জন্মবধিররা শব্দে শুনেছিল, খোঁড়ারা পায়ে চলতে পেরেছিল, শৃঙ্খল বন্ধনগুলো ছিন্ন হয়ে পড়ে গিয়েছিল।—অপদান অর্থকথা

এভাবে অপরিমেয় শ্রীসৌভাগ্যের দ্বারা পূজিত মহাপুরুষ অনেক প্রকারে আশ্চর্যজনক ঘটনার সংঘটিত করে সর্বজ্ঞতা লাভ করে সকল বুদ্ধের অপরিত্যাজ্য স্বগতোক্তি করলেন :

অনেকজাতিসংসারং ছন্দাবিস্সং অনিব্বিসং,

গহকারকং গবেসন্তো দুক্খা জাতি পুনপ্পুনং,

গহকরক দিট্ঠোসি, পুন গেহং ন কাহসি,

সব্বা তে ফাসুকা ভগ্গা গহকুটং বিসঙ্খতং,

বিসঙ্খারং গতং চিত্তং, তণ্হানং খযমজ্ঝাগা।

‘দেহরূপ গৃহনির্মাতাকে অনুসন্ধান করতে করতে তার দেখা না পেয়ে কতবারই না সংসার জন্মগ্রহণ করলাম। পুনঃপুন জন্মগ্রহণ দুঃখজনক, হে গৃহকারক, এবার তোমার দেখা পেয়েছি আর তুমি (এই দেহরূপী) গৃহ নির্মাণ করতে পারবে না, তোমার কাঠ দণ্ড ভাঙা হয়ে গেছে, গৃহকুট নষ্ট হয়েছে। (আমার) চিত্ত সংস্কার হতে মুক্ত এবং তৃষ্ণাগুলো ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে।—ধর্মপদ

বোধিপালঙ্কের আশপাশে সাত স্থানে সাত সপ্তাহ

১. মহাবোধিতরুমূল : তখন বুদ্ধ ভগবান সবেমাত্র বুদ্ধত্ব লাভ করে মহাবোধিতরুমূলে চার হাত দূরত্বে পূর্বদিকে অবস্থিত সপ্ত রত্নখচিত বোধিপালঙ্কের বজ্রাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় উরুবেলায় অবস্থান করছিলেন, নৈরঞ্জনা নদীর তীরে বোধিগাছের গোড়ায়। তারপর ভগবান বোধিতরুমূলে সপ্তাহকাল একাসনে ধ্যানপদ্মাসনে বিমুক্তিসুখ অনুভব করছিলেন। ভগবান রাতের প্রথম যামে প্রতীত্যসমুৎপাদ-তত্ত্ব নিজের মনে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করলেন, ‘যদি এই কারণটি থাকে তবে এই ফলটি হয়। এটির সৃষ্টি হলে এটিও সৃষ্ট হয়; যথা : অবিদ্যার কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নামরূপ, নামরূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জন্ম, জন্মের কারণে জরা, মৃত্যু, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও হা-হুতাশ উৎপন্ন হয়। এভাবে সম্পূর্ণ দুঃখরাশি সৃষ্টি হয়ে থাকে।’

দুঃখ যে এভাবেই উৎপন্ন হয়ে থাকে-ভগবান এই সত্যার্থ জেনে সে সময় এই প্রীতিগাথা উচ্চারণ করলেন :

শ্রদ্ধা আদি বোধিপক্ষীয় ধরম,

প্রকাশ্যে যখন হয় সমাগম,

ধ্যানী, বীর্যবান ব্রাহ্মণের হয়

সকল সংশয় তখন লয়—

এই দুঃখরাশি কোন হেতু আসে

যবে হয় সেই জ্ঞানের উদয়।

—প্রথম বোধিসূত্র, বোধিবর্গ, উদান

সে সময় ভগবান রাতের মধ্যম যামে পটিচ্চসমুপ্পাদে বা প্রতীত্যসমুৎপাদ ধর্মে শেষ হতে প্রথম পর্যন্ত প্রতিলোম ভাবনাক্রমে সুন্দরভাবে মনোনিবেশ করলেন, ‘যদি এই কারণ না থাকে তা হলে এই ফল হয় না। এর নিরোধে এর নিরোধ হয়; যথা : অবিদ্যার নিরোধে সংস্কারের নিরোধ, সংস্কারের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ, ভবের নিরোধে জন্মের নিরোধ, জন্মের নিরোধে জরা, মৃত্যু, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও হা-হুতাশের নিরোধ হয়। এভাবেই সম্পূর্ণ দুঃখরাশির নিরোধ হয়ে থাকে।’

এই সত্যার্থ জেনে ভগবান সে সময় এই প্রীতিগাথা উচ্চারণ করলেন :

শ্রদ্ধা আদি বোধিপক্ষীয় ধরম,

প্রকাশ্যে যখন হয় সমাগম,

ধ্যানী, বীর্যবান ব্রাহ্মণের হয়

সকল সংশয় তখন লয়—

দুঃখের কারণ কীসে ধ্বংস হয়

যবে হয় সেই জ্ঞানের উদয়।

—দ্বিতীয় বোধিসূত্র, বোধিবর্গ, উদান

তখন ভগবান রাতের শেষ যামে প্রতীত্যসমুৎপাদ (পটিচ্চসমুপ্পাদ) ধর্মে সুন্দরভাবে অনুলোম ও প্রতিলোম ভাবনানুক্রমে মনোনিবেশ করলেন, ‘যদি এটা থাকে তবে এটা হয়, এর উৎপত্তিতে এর উৎপত্তি হয়। যদি এটা না থাকে তবে এটাও হয় না, এর নিরোধে এরও নিরোধ হয়; যথা : অবিদ্যার কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নামরূপ, নামরূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জন্ম, জন্মের কারণে জরা, মৃত্যু, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও হা-হুতাশের উৎপত্তি হয়। এভাবেই সম্পূর্ণ দুঃখরাশির সমুদয় হয়ে থাকে।’

‘অবিদ্যারই অশেষ বিরাগ ও নিরোধে সংস্কারের নিরোধ, সংস্কারের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ, ভবের নিরোধে জন্মের নিরোধ, জন্মের নিরোধে জরা, মৃত্যু, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও হা-হুতাশের নিরোধ হয়।’

এভাবেই সেই সম্পূর্ণ দুঃখরাশি নিরুদ্ধ হয়ে যায়, এই সত্যার্থ জেনে ভগবান সে সময় এই প্রীতিগাথা উচ্চারণ করলেন :

শ্রদ্ধা আদি বোধিপক্ষীয় ধরম,

প্রকাশ্যে যখন হয় সমাগম,

ধ্যানী, বীর্যবান ব্রাহ্মণের হয়

ধরম সংগ্রামে তখন জয়—

তপন আকাশে যথা অবভাসে

বিনাশে মারের সৈন্যচয়।

—তৃতীয় বোধিসূত্র, বোধিবর্গ, উদান

প্রতীত্যসমুৎপাদ ধর্মকে অনুলোম প্রতিলোমভাবে লক্ষকোটি বার সমাপত্তি ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে সম্যকসম্বুদ্ধ বিমুক্তিসুখ উপভোগ করতে করতেই বোধিপালঙ্কে দেবরাজ ইন্দ্র, সুযাম, তুষিত, মহাব্রহ্মা ও যাবতীয় দেবতাগণের পূজা প্রাপ্ত হয়ে একাসনেই এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন।—উদান

২. অনিমেষ চৈত্য: ভগবান স্বর্ণময় বোধিপালঙ্কে সপ্তাহকাল বিমুক্তিসুখ উপভোগ করে বোধিপালঙ্ক হতে উঠলেন এবং ধীরে ধীরে বোধিতরুর পূর্ব-উত্তর দিকে চৌদ্দ কদম অগ্রসর হয়ে দাঁড়ালেন। বোধিপালঙ্কের প্রতি দৃষ্টিপাত করে ‘আমি চার অসংখ্য লাখের অধিক কল্পব্যাপী পারমী সঞ্চয় করে এই বোধিতরুমূলে অবস্থিত এই রত্নময় পালঙ্কে অধিষ্ঠান করে সর্বজ্ঞতা জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছি’ এটা চিন্তা করে তিনি অপলকভাবে সকৃতজ্ঞ নয়নে সেদিকে দৃষ্টিপাত করতে থাকেন এবং এভাবে এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন।

যেখানে ভগবান দাঁড়িয়ে বোধিপালঙ্কের প্রতি অনিমেষ নয়নে সকৃতজ্ঞ চিত্তে দৃষ্টিপাত করে রইলেন, তা ‘অনিমেষ চৈত্য’ বলে পরিচিতি লাভ করেছে।

সপ্তাহকালব্যাপী ভগবান কর্তৃক অনিমেষ নয়নে বোধিপালঙ্ক দেখার সময় তা দেখে কিছুসংখ্যক দেবতার মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। তাঁরা বলতে লাগলেন, সম্ভবত সিদ্ধার্থের কর্তব্য এখনো শেষ হয়নি। একনাগাড়ে এক সপ্তাহ তিনি বোধিপালঙ্কে অবস্থান করেছিলেন। বোধিপালঙ্ক হতে উঠলেও কিছু দূরে গিয়ে তিনি বোধিপালঙ্কের দিকে অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলেন। নিশ্চয় তিনি আসনের মায়া কাটাতে পারছেন না। বুদ্ধ সেই দেবতাগণের চিন্তিত বিষয় অবগত হলেন এবং দেবতাগণের সন্দেহ অপনোদনের জন্য মাটি হতে যোজনপ্রমাণ শূন্যে উঠে যমক প্রাতিহার্য (ঋদ্ধি) প্রদর্শন করলেন।—অপদান অর্থকথা

৩. রত্ন চংক্রমণ : বুদ্ধ এভাবে ঋদ্ধি প্রদর্শনের দ্বারা দেবতাগণের সন্দেহ অপনোদন করলেন এবং শূন্য হতে অবতরণ করে বোধিপালঙ্ক ও অনিমেষ চৈত্যের মধ্যস্থলে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা ষাট হাত ও বিশ হাত প্রশস্ত স্থানে পায়চারি করতে লাগলেন। এভাবে পায়চারি করতে করতে বুদ্ধ এক সপ্তাহকাল কাটিয়ে দিলেন। এই চংক্রমণের পথটি ‘রত্ন চংক্রমণ’ স্থান নামে অভিহিত।—অপদান অর্থকথা

৪. রত্নঘর : মহাবোধিতরু হতে কিছু দূরে উত্তর-পশ্চিম কোণে দেবতাদের চল্লিশ হাত পরিমিত সপ্ত রত্নময় রত্নঘর নির্মাণ করলেন। সেখানে সমাসীন হয়ে ভগবান বুদ্ধ গম্ভীর অর্থপূর্ণ অভিধর্ম ও অনন্তের মতো বিশিষ্ট পট্‌ঠান প্রকরণগুলো গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। এই সময় বুদ্ধের শরীর হতে চারদিকে নীল, হলুদ, লাল, সাদা, কমলা ও প্রভাস্বর, এই ছয়টি রশ্মি প্রোজ্জ্বলভাবে নির্গত হয়ে ওপরে ভবাগ্র, নিচে মাটি, জল ও বাতাসের পরিধি ভেদ করে অনন্ত চক্রবালব্যাপী উদ্ভাসিত হলো।

ভগবান বুদ্ধ এই অবস্থায় দেবনির্মিত রত্নঘরে এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন। অভিধর্ম রত্নের গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন বলে এটা রত্নঘররূপে পরিচিত হয়েছে।—অপদান অর্থকথা

৫. অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষমূল : এরূপ বুদ্ধ চার সপ্তাহ বোধিতরুর কাছাকাছি স্থানসমূহে অতিবাহিত করলেন। এরপর বোধিতরু হতে পূর্বদিকে বত্রিশ পদক্ষেপ অতিক্রম করে অজপাল নামে ন্যাগ্রোধ গাছের গোড়ায় গেলেন। সেখানেও তিনি লব্ধ ধর্মের গভীরে নিমগ্ন হয়ে বিমুক্তিসুখ উপভোগ করতে করতে পুনরায় সমাহিত হলেন।

তখন মার দেবপুত্র এসে চিন্তা করল এতদিন ধরে আমি সিদ্ধার্থের সংকল্পচ্যুতি ঘটাবার জন্য পিছু অনুসরণ করেছি। কিন্তু কোনো প্রকারে তাঁকে সংকল্পচ্যুত করতে পারিনি। তাঁর কোনো প্রকার স্খলিত ভাব দেখতে পাইনি। তিনি সত্যিই আমার রাজ্যসীমা অতিক্রম করে আমার ক্ষমতার বাইরে চলে গেছেন।

এই ভেবে মার দুঃখভারাক্রান্ত মনে প্রশস্ত রাজপথে বসে কী কারণে সে সিদ্ধার্থের কাছে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হলো তা নির্ধারণ করতে গিয়ে ষোলোটি কারণ খুঁজে পেল। সেই অনুসারে এক এক করে ভূমিতে ষোলোটি রেখা আঁকতে লাগল।

এই মহাশ্রমণ বোধিপালঙ্ক লাভ করেছে। তার প্রথম কারণ সে দানপারমী পূর্ণ করেছে কিন্তু আমি দানপারমী পূর্ণ করিনি। সেই হেতু তাঁর মতো মহান হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারিনি এবং বোধিপালঙ্ক লাভ করিনি, এই বলে মার রাজপথে একটি রেখা আঁকল।

আমি তাঁর মতো শীলপারমী, নৈষ্ক্রম্যপারমী, প্রজ্ঞাপারমী, বীর্যপারমী, ক্ষান্তিপারমী, সত্যপারমী, অধিষ্ঠানপারমী, মৈত্রীপারমী ও উপেক্ষাপারমী পূর্ণ করিনি। এই বলে মার আরও নয়টি রেখা আঁকল। এরপর মার আরও চিন্তা করে বলল, আমি তাঁর মতো ধনসম্পদত্যাগ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গত্যাগ, পুত্রকন্যাত্যাগ, স্ত্রীত্যাগ, জীবনত্যাগ ও বিশ্বপ্রাণীর কল্যাণাচারণ, জাতির কল্যাণাচারণ, বুদ্ধত্ব আচরণ করিনি বলে তাঁর মতো মহৎ ও শ্রেষ্ঠ হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারিনি। সেইহেতু আমি বোধিপালঙ্ক লাভ করতে পারিনি। এই বলে মার আরও ছয়টিসহ মোট ষোলোটি অর্থযুক্ত রেখা প্রশস্ত রাজপথে আঁকল। তখন তার তিন কন্যা-তৃষ্ণা, রতি ও রাগ অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত চিত্তে তাদের পিতা মারকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। ‘বাবা, তুমি ভাত-পানি ত্যাগ করে কোথায় গিয়েছ? তোমার মুখের চেহারা এত বিষন্ন, দুঃখগ্রস্ত দেখা যাচ্ছে কেন, কীসের গস্নানিতে তুমি এত জর্জরিত হয়েছ?’ তখন ক্লান্ত বিষন্ন স্বরে দেবপুত্র মার উত্তর দিল, ‘মা এই শ্রমণ গৌতম আমার সর্বাধিক কাম্য এই স্বর্ণময় বোধিপালঙ্কে আরোহণ করে বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন। এখন সম্পূর্ণ আমার ক্ষমতার বাইরে চলে গেছেন। এতকাল চেষ্টা করেও আমি তাঁর পতন ঘটাতে পারলাম না। সেই কারণেই আমি এত মর্মাহত হয়েছি।’ কন্যাত্রয় মারকে প্রবোধ দিয়ে উত্তর দিল, যদি তাই হয় চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমরা স্ত্রী-জাতি। আমাদের ছলনার দ্বারা তাঁকে বশে আনব। তাঁকে আমাদের সঙ্গে করে আপনার কাছে নিয়ে আসব। মার ব্যর্থতার সুরে উচ্চারণ করল, ‘না মা, তোমাদের পক্ষে তা অসম্ভব। এই মহান পুরুষ অকম্পিত শ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁকে কেউই বশে আনতে পারবে না।’ ‘কিন্তু, বাবা, আমরা নারীজাতি। এখনই তাঁকে মায়ার শেকলে বেঁধে তোমার কাছে নিয়ে আসব। তুমি নিশ্চিন্ত হও বাবা’। মারকন্যাগণ পিতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় নিলেন। এরপর মারকন্যারা (তৃষ্ণা, রতি ও রাগ) সর্বালংকারে বিভূষিতা হয়ে অজপাল ন্যাগ্রোধমূলে ভগবান বুদ্ধের কাছে নিবেদন করল, ‘হে শ্রমণ, আমরা তোমার পদসেবা করতে ইচ্ছুক। তোমার পদসেবা করতে এসেছি।’

কিন্তু তাদের কথায় ভগবান বুদ্ধ ভ্রূক্ষেপও করলেন না। তখন বিমুক্তচিত্ত সেই মহাপুরুষ তৃষ্ণাক্ষয়জনিত বিবেকসুখ উপভোগ করতে করতে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। তাদের এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে মারকন্যাগণ তাদের মধ্যে পরামর্শ করল। ‘সাধারণত পুরুষ মানুষের প্রেমের অভিরুচিতে বিভিন্ন রকমের পার্থক্য দেখা যায়। কোনো কোনো পুরুষ কুমারীদের প্রতি, কোনো কোনো পুরুষ ষোলো বছর বয়স্কা তরুণীর প্রতি, কেউ কেউ মধ্যবয়স্কা নারীদের প্রতি, আবার কেউ কেউ প্রবীণদের প্রতি সহজে আসক্ত হয়ে থাকে। কাজেই চলো আমরা ভিন্ন ভিন্ন বয়সের নারীদেহ সৃষ্টি করে তাঁকে প্রলুব্ধ করি।’ এই পরামর্শ করে তারা স্বল্পবয়স্ক কুমারী হতে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের শত শত লাবণ্যময়ী নারীদেহ সৃষ্টি করল। তাদের মধ্যে কেউ স্বল্পবয়সি কুমারী, কেউ পূর্ণ যৌবনা, কেউ পূর্ণ যৌবনা হলেও মাতৃত্বের অধিকারী হয়নি। কেউ মাত্র এক সন্তানের মাতা। কেউ দুই সন্তানের মাতা। কেউ প্রৌঢ়া। আবার কেউ প্রবীণা মহিলার মতো প্রতীয়মান হলো। মারকন্যাগণ বহুরূপ ধারণ করে বয়স অনুসারে দলে দলে পৃথকভাবে ভগবানকে প্রেম নিবেদন করল, ‘হে শ্রমণ, আমরা তোমার পদসেবা করতে চাই।’ তারা এভাবে ভগবানের কাছে ছয়বার প্রার্থনা করল। কিন্তু ভগবান তাদের কথায় কোনো আগ্রহ না দেখায়ে বললেন, ‘তোমরা এখান হতে শিগগিরই সরে যাও। কীসের আশায় তোমরা এই প্রচেষ্টা শুরু করেছ। কামনাবাসনামুক্ত পুরুষের সামনে তোমাদের এই প্রলোভন, এই মায়ার ছলনা শোভা পায় না। তথাগত বুদ্ধের লোভ, দ্বেষ, মোহ সমূলে ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তিনি তাঁর তৃষ্ণাবিমুক্তির ইঙ্গিতসূচক নিম্নোক্ত গাথা উচ্চারণ করলেন :

যস্স জিতং না’ব জীযতি জিত মস্স নো যো যাতি কোচি লোকে।

ত্বং বুদ্ধমনন্ত গোচরং অপদং কেন পদেন নেস্সথ।

যস্স জালিনী বিসত্তিকা, তণ্হা নত্থি কুহিঞ্চি নেতবে—

ত্বং বুদ্ধমনন্ত গোচরং অপদং কেন পদেন নেস্সত্থ।

হে মারকন্যাগণ, বুদ্ধ ক্লেশরূপ শত্রুকে সম্যকভাবে জয় করেছেন। সেই শ্রেষ্ঠ বিজয়ী সম্যকসম্বুদ্ধকে ত্রিলোকে কেউ পরাজিত করতে সক্ষম নয়। সেসব তৃষ্ণাবিজয়ী সম্যকসম্বুদ্ধকে কী করে তোমরা তৃষ্ণার আকর্ষণে টেনে নেবে?

বুদ্ধ এই গাথাদ্বয় মারকন্যাগণকে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি ক্লেশরূপ শত্রুকে পরাভূত করেছেন। কোনো আকর্ষণের প্রতি তাঁর আগ্রহ নেই। মারকন্যাগণ তোমরা বুদ্ধকে আকৃষ্ট করার জন্য যে ছলচাতুরী, কলাকৌশল অবলম্বন করেছ, ওই সব কেবল যারা রাগ, দ্বেষ, মোহ ও অবিদ্যার ক্লেশযুক্ত হয়ে প্রমত্ত রয়েছে তাদেরই রমিত করতে সক্ষম হবে। বুদ্ধ ওই সব শ্মশানে নিক্ষিপ্ত দুর্গন্ধযুক্ত গলিত মৃতদেহের মতো মনে করে ত্যাগ করেছেন। এই বলে বুদ্ধ মারকন্যাগণকে অনেক ধর্মোপদেশ দান করলেন। বুদ্ধের অমৃতময় বাণী শুনে মারকন্যাদের মনে জাগ্রত হলো, ‘আমাদের বাবা সত্যই বলেছেন, জগতে যাঁরা তৃষ্ণামুক্ত, অর্হৎ, সুগত, প্রলোভনের দ্বারা তাঁদের বিচ্যুতি করা সম্ভব নয়।’ এভাবে মারকন্যাগণ বিফল হয়ে পিতার কাছে ফিরে গেল।

মারকন্যাগণ অন্তর্হিত হলে হুহুঙ্কুজাতীয় এক ব্রাহ্মণ বুদ্ধের কাছে এসে ‘হে শ্রমণ গৌতম, ব্রাহ্মণ কাকে বলে?’ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। তার উত্তরে বুদ্ধ বললেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, যে ব্যক্তি প্রবলভাবে হুহুঙ্কু করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ক্লেশগুলো দমন করেন, সকল প্রাণীদের প্রতি দয়া ও মমতাসম্পন্ন, রাগাদি ক্লেশগুলো পরিত্যাগ করেছেন এবং শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য, সর্বসম্মত পুণ্যক্রিয়ায় রমিত থাকেন, সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন এবং ব্রাহ্মণ বলে অভিহিত হয়ে থাকেন।

মারকন্যাগণ এবং হুহুঙ্কু নামে ব্রাহ্মণকে এভাবে ধর্মরস পরিবেশন করে বুদ্ধ অজপাল ন্যাগ্রোধ গাছের গোড়ায় এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন। এভাবে অবস্থান করার জন্য এ স্থানকে অজপাল চৈত্যও বলা হয়।—অপদান অর্থকথা

৬. মুচলিন্দ হ্রদ : এই অজপাল সপ্তাহের পর বুদ্ধ মহাবোধিতরুর পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একান্ন পদক্ষেপ দূরত্বে অবস্থিত মুচলিন্দ নামে হ্রদের কাছে মুচলিন্দ গাছের গোড়ায় এসে বসলেন। তখন অসময়ে অকালে মেঘ স্তরে স্তরে জমতে লাগল এবং শীতল বাতাস প্রবাহিত হতে লাগল। অবশেষে তীক্ষ্ণ শীতল বাতাসসহ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। এতে বুদ্ধকে মশা, ডাঁশ, কীটাদি, সরীসৃপ এবং শীতল বাতাস ও বৃষ্টিধারা হতে সুরক্ষা করার উদ্দেশ্যে মুচলিন্দ নাগরাজ নিজ ভবন হতে বের হলেন। এই নাগরাজ নিজের ঋদ্ধিবলে রত্নবিমণ্ডিত বিমান (প্রাসাদ) সৃষ্টি করে বুদ্ধকে সেই বিমানে আরোহণ করায়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে সুরক্ষা করতে পারতেন, কিন্তু পুণ্যার্জনের আশায় তিনি নিজের শরীরের দ্বারা বুদ্ধকে রক্ষা করতে মনস্থ করলেন। তিনি শরীরের একাংশের দ্বারা পালক রচনা করে বুদ্ধকে উপবেশন করালেন এবং অপর অংশের দ্বারা বুদ্ধকে সাতবার পরিবেষ্টিত করলেন আর সুবিস্তৃত ফণার দ্বারা তথাগত বুদ্ধের মাথার ওপর চাঁদোয়া টাঙিয়ে বৃষ্টির ধারা প্রতিহত করলেন।

বুদ্ধ মুচলিন্দ নাগরাজের বেষ্টনীর ভেতর ফলসমাপত্তিতে প্রবেশ করে সপ্তাহ কাটিয়ে দিলেন। সাত দিন পর বৃষ্টিবাদল অবসান হলে নাগরাজ মনুষ্যরূপ ধারণ করে বুদ্ধের শ্রীচরণে বন্দনা করে স্থিত হলে বুদ্ধ নিম্নলিখিত গাথা পাঠ করলেন :

‘সুখো বিবেকো তুট্ঠস্স, সুতধম্মস্স পস্সতো … ।’

চার মার্গজ্ঞানে নির্বাণ দেখে অর্হৎগণ সম্পূর্ণ সুখ পরিভোগ করে থাকেন। তদ্রূপ সত্ত্বদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টিকারী দ্বেষত্যাগও অত্যন্ত সুখাবহ। রাগ পরিত্যাগ করে পঞ্চ কামগুণে রমিত না হওয়া অত্যন্ত সুখাবহ। ‘আমি’ নামে অভিমানে স্ফীত হয়ে সত্ত্বগণকে নিপীড়ন না করে সহিষ্ণু বা ক্ষান্তিভাব অবলম্বন করা অত্যন্ত সুখাবহ। এটাকে পরমতর সুখ বলে বুদ্ধ নাগরাজকে ধর্মদেশনা করলেন। এ স্থানটি মুচলিন্দ চৈত্য নামে অভিহিত হয়েছে।—অপদান অর্থকথা

৭. রাজায়তন বৃক্ষমূল : মহাবোধিতরুর দক্ষিণ দিকে চল্লিশ পদক্ষেপ দূরত্বে গিয়ে বুদ্ধ রাজায়তন গাছের গোড়ায় বসলেন। এখানে তিনি সপ্তাহকালব্যাপী বিমুক্তিসুখে ধ্যানমগ্ন হলেন। পূর্ণজ্ঞান লাভের পর এভাবে সাত সপ্তাহ পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘকালের মধ্যে বুদ্ধ মুখ ধোয়া, স্নান কিংবা আহার গ্রহণ কোনো কৃত্য সমপাদন করেননি। ধ্যানসুখ, মার্গসুখ, ফলসুখেই তিনি অতিবাহিত করেছেন।—অপদান অর্থকথা

দ্বি-বাচিক উপাসক

তখন তপস্সু ও ভল্লিক নামে দুইজন ব্যবসায়ী উৎকল হতে সেখান দিয়ে দীর্ঘপথ ভ্রমণ করছিলেন। তাঁদের জ্ঞাতিদেবতা তাঁদের বললেন, ‘মহাশয়, ভগবান বুদ্ধত্ব লাভ করে রাজায়তন-মূলে অবস্থান করছেন। আপনারা তাঁকে “মণ্ড” ও “মধুপিণ্ড” দানে পূজা করুন। তা আপনাদের দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে।’ তারপর তাঁরা “মণ্ড” ও “মধুপিণ্ড” হাতে ভগবানের কাছে উপস্থিত হলেন এবং ভগবানকে বন্দনা করে একপাশে দাঁড়ালেন। একপাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা ভগবানকে বললেন, ‘ভন্তে, আপনি আমাদের “মণ্ড” ও “মধুপিণ্ড” গ্রহণ করুন, যেন এটা আমাদের দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হয়।’

ভগবান ভাবলেন, ‘তথাগত নিজ হাতে ভিক্ষা গ্রহণ করেন না; আমি “মণ্ড” ও “মধুপিণ্ড” কীসে গ্রহণ করব?’ তখন চার লোকপাল মহারাজা নিজ চিত্তে ভগবানের চিত্তপরিবিতর্ক জানতে পেরে চারদিক হতে চারটি শিলাপাত্র ভগবানের কাছে উপস্থিত করে বললেন, ‘ভন্তে, এতে “মণ্ড” ও “মধুপিণ্ড” গ্রহণ করুন।’

ভগবান সেই মহার্ঘ শিলাপাত্রের প্রত্যেকটিতে ‘মণ্ড’ ও ‘মধুপিণ্ড’ গ্রহণ করে ভোজন করলেন। বণিকদ্বয় ভগবানকে বললেন, ‘ভন্তে, আমরা উভয়ে ভগবানের শরণাগত এবং তাঁর প্রচারিত ধর্মের শরণাগত হচ্ছি, ভগবান আমাদের আজ হতে আমরণ শরণাগত উপাসক বলে অবধারণ করুন।’ তাঁরা জগতে সর্বপ্রথম দ্বিবাচিক উপাসক হয়েছিলেন।—মহাবর্গ

তাঁদের একজন বুদ্ধকে নিবেদন করলেন, ভন্তে অনুগ্রহ করে পূজা করার জন্য আপনার যে-কোনো একটা নিদর্শন দান করুন।’ বুদ্ধ মাথায় ডান হাত দিয়ে টেনে কয়েক গুচ্ছ কেশধাতু প্রার্থনাকারীকে দান করলেন এবং অপরজনকে একটি জলছাকনি দান করলেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বণিকদ্বয় কেশধাতুগুলো মাঝখানে স্থাপন করে এক বিহার নির্মাণ করালেন।

এই খবরটি সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো খবর

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২,০৩৭,৫৮৮
সুস্থ
১,৯৯২,৬৯৪
মৃত্যু
২৯,৪৪৩
সূত্র: আইইডিসিআর

সর্বশেষ

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু
স্পন্সর: একতা হোস্ট
জ্ঞানঅন্বেষণ কর্তৃক সকল অধিকার সংরক্ষিত © ২০২০
Developed By: Future Tech BD