জাতীয়

বৌদ্ধ দর্শনে জীবন ও সত্যকে জানার সহজ পথ

নিউজটি সেয়ার করুন

সংবাদ শিরোনাম

  • বৌদ্ধ দর্শনে জীবন ও সত্যকে জানার সহজ পথ

নশ্বর সুজয়> একজন মানুষ যদি জ্ঞানচর্চায় ন্যুনতম মনোনিবেশ করে, যদি সত্যিকার অর্থেই সত্যের কি রূপ তা উপলব্ধি করতে চায়, যদি সত্যকে জানার জন্য ন্যুনতম বাসনাও থাকে, তবে সর্বপ্রথম তার করনীয় হবে নিজেকে জানা। তখন সে না আস্তিক হতে পারবে, না নাস্তিক। সেই এ দল কিংবা ঐ দল যেকোনো দলের হোক না কেন; এদেশ কিংবা ঐ দেশ যেকোনো দেশের হোক না কেন, যাই হোক না কেন। না সে কোনো অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ত্বকে অনুভব করতে পারবে, না সে কোনো অদৃশ্য শক্তিকে পূর্নরুপে স্বীকার করতে পারবে। তবে সেই ব্যক্তি  এটাই বুঝতে পারবে যে  পুরো জগত,পুরো বিশ্ব, পুরো প্রকৃতি স্বীয় স্বীয়  স্বকীয় গতিতে চলমান। পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি সুক্ষ্মানুসুক্ষ্ম ধূলিকণাও একে অন্যের উপর নীর্বরশীল।

আজ থেকে আড়াই হাজার পূর্বে তথাগত বুদ্ধ ঠিক এমন সত্যটিকেই ব্যাখ্যা করেছিলেন।
বুদ্ধ চলমান জীবনের আদি – অন্ত বুঝাতে প্রতীত্যসমুৎপাদের ব্যাখ্যা করেন। “প্রতীত্যসমুৎপাদ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘একটি বস্তুর কিংবা ঘটনার অধীনে বা উপস্থিতিতে (আগমনে) অন্য কোন বস্তুর বা ঘটনার উৎপত্তি’। মজ্ঝিমনিকায় (১/৪/৮) বলা হচ্ছে-
‘অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-(মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮)
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
প্রতীত্যসমুৎপাদকে সমগ্র বৌদ্ধদর্শনের আধার বলা হয়। স্বয়ং বুদ্ধের বাণী থেকেই জানা যায়-
“যিনি প্রতীত্য-সমুৎপাদকে দেখেন, তিনি ধর্মকে (বৌদ্ধদর্শন) দেখতে পান, যিনি ধর্মকে দেখেন তিনি প্রতীত্য-সমুৎপাদকে দেখেন। পঞ্চ উপাদান স্কন্ধও প্রতীত্য সমুৎপন্ন।”  (মজ্ঝিমনিকায়: ১/৩/৮)।

বুদ্ধ কোন অধিবিদ্যা বা আধ্যাত্মবাদের দার্শনিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন নি। তিনি সংসারের ক্লেশকর প্রপঞ্চগুলো থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় হিসেবে কিছু আচারমার্গের নীতিপন্থা প্রচারেই আগ্রহী ছিলেন।
তাই সাগ্রহে বুদ্ধ কতকগুলি দার্শনিক তত্ত্ব-বিষয়ে তাঁর স্বাধীন ও স্বকীয় সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। বলাই বাহুল্য যে, তাঁর দার্শনিক মত অত্যন্ত দুরূহ ও অনন্যসাধারণ। তাঁর অনেক সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষের সংস্কারকে রীতিমতো বিচলিত করে।
সর্বগ্রাসী দুঃখের কারণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায় সন্ধানই গৌতম বুদ্ধের সাধনার লক্ষ্য। জগত দুঃখময়, দুঃখের কারণ আছে এবং দুঃখ নিরোধ সম্ভব, এই দুঃখরহস্য উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়েই বুদ্ধের সাধনায় সিদ্ধিলাভ। এবং এই দুঃখ থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে আচারমার্গের নির্দেশনাই বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মমত।
তথাগত বুদ্ধ স্বয়ং বলেছেন-
‘জাতি পি দুক্খা, জরা পি দুক্খা, ব্যাধি পি দুক্খা, মরণং পি দুক্খং, সোক-পরিদেব-দুক্খদোমনস্স-উপায়াসা পি দুক্খা, যং পি ইচ্ছং ন লভতি তং পি দুক্খং, সংকখিত্তেন পঞ্চুপাদানক্খন্দা দুক্খা।’- (মহাসতিপতানসূত্ত-২২/১৮)
অর্থাৎ : জন্মে দুঃখ, নাশে দুঃখ, রোগ দুঃখময়, মৃত্যু দুঃখময়। অপ্রিয়ের সংযোগ দুঃখময়, প্রিয়জনের বিয়োগ দুঃখময়। সংক্ষেপে পঞ্চস্কন্ধই দুঃখময়। সকল কিছু দুঃখময়।
এই দুঃখ অল্প নয়, প্রচুর, অপর্যাপ্ত। তাই ‘ধম্মপদে’র জরাবর্গে তিনি বলেছেন-
‘অনেকজাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং,
গহকারকং গবেসন্তো, দুক্খা জাতি পুনপপুনং।’ (ধম্মপদ-জরাবর্গ-৮)
অর্থাৎ : এ (দেহরূপ) গৃহের নির্মাতাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে (জ্ঞানাভাবে) তাকে না পেয়ে আমি বহু জন্মজন্মান্তর সংসার পরিভ্রমণ করলাম। বার বার জন্ম গ্রহণ করা দুঃখজনক।
সংসার দুঃখেই পরিপূর্ণ। এবং সকল দুঃখের নিদান যে প্রকৃতপক্ষে পঞ্চস্কন্ধরূপ দেহ ও দেহ-সম্পর্কিতই, ধম্মপদের সুখবর্গে বুদ্ধ-বচনে তা-ই প্রতিধ্বনিত হয়েছে-
‘নত্থি রাগসমো অগ্গি নত্থি দোসসমো কলি,
নত্থি খন্ধাসমা দুক্খা নত্থি সন্তিপরং সুখং।’ (ধম্মপদ-সুখবর্গ-৬)
অর্থাৎ : আসক্তির (রাগ) ন্যায় আগুন নেই, দ্বেষের সমান পাপ কলি নেই, পঞ্চস্কন্ধের মতো দুঃখ নেই এবং নির্বাণের চেয়ে সুখ নেই।

নিজের অবিদ্যাপ্রসূত কর্ম দ্বারাই মানুষ দুঃখকে বরণ করে জন্মশৃঙ্খলে বন্দি হয়, আবার সম্যক জ্ঞানের মাধ্যমে অবিদ্যা দূর করে নির্বাণলাভের মাধ্যমে মানুষ এই জন্মরূপ দুঃখ থেকে পরিত্রাণও পেতে পারে। এজন্যে মানুষকে অন্য কোন অলৌকিক নিয়ন্ত্রকের অধীনস্থ হতে হয় না।

তাই বুদ্ধ উপক আজীবকের প্রশ্নোত্তরে বুদ্ধ বজ্রনির্ঘোষে বলেছিলেন-
“সব্বাভিভূ সব্ববিদূহমস্মি সব্বেসু ধম্মেসু অনূপলিত্তো,
সব্বঞ্জহো তণ্হক্খযে বিমুত্তো সযং অভিঞায কমুদ্দিসেয্যং।”
– আমি সমস্ত ত্রৈভূমিক ধর্মকে মর্দন করেছি, সমস্ত চাতুর্ভূমিক ধর্ম আমার জ্ঞাত, সমস্ত জ্ঞানাবরণের হেতুকে সমূলে উচ্ছেদ করে ত্রৈভূমিক ধর্মে অলিপ্ত, সকল প্রকার তৃষ্ণা সমূলে উৎপাটন করে নির্বাণ লাভে বিমুক্ত, স্বয়ম্ভূ জ্ঞানে আদি অন্ত অবগত সুতরাং কাকেই গুরু বা ঈশ্বর বলে স্বীকার কবব? ন মে আচরিযা অত্থি- আমার অন্য কোনো গুরু বা ঈশ্বর নেই।
(-মহাবগ্গো)
“ন হেত্থ দেবো ন ব্রহ্ম সংসারমত্থি কারকো,
সুদ্ধা ধম্মা পবত্তন্তি হতু সম্ভারপচ্চযাতি।”
-নাম রূপের ঊর্ধ্বে দেব নাই, ব্রহ্ম নাই, সংসারের স্রষ্টা বা কারক নাই, হেতু সম্ভার প্রত্যয় শুদ্ধ (নাম-রূপ) ধর্ম প্রবর্তিত মাত্র। -(কঙ্খাবিতরণী)
তাই তো, বোধিমূলেই বুদ্ধত্ব লাভের পর “আবিজ্জা পচ্চযা সঙ্খরা” প্রভৃতি দ্বাদশ “পটিচ্চসমুপপাদ” বর্ণনা প্রসঙ্গে ঈশ্বরের অস্বীকৃত হয়েছে।
“তেন অবিজ্জাদিহেব কারণেহি ন ইস্সর নিম্মানাদীহি দস্সেতি-“
অবিদ্যা প্রভৃতি দ্বাদশ পটিচ্চসমুপপাদ কারণে সত্ত্বগণের উৎপত্তিতে ঈশ্বর কর্তৃক নির্মিত বা সৃষ্টি বলে প্রদর্শিত হয় নি। -(সারত্থ দীপনী)।
ধম্মপদের দণ্ডবগগো’তে তাই বুদ্ধ বলেছেন
‘অস্সো যথা ভদ্রো কসানিবিট্ঠো
আতপিনো সংবেগিনো ভবাথ,
সদ্ধায় সীলেন চ বিরিয়েন চ
সমাধিনা ধম্ম বিনিচ্ছয়েন চ,
সম্পন্ন বিজ্জাচররণা পতিস্সতা
পহস্সথ দুক্খমিদং অনপ্পকং। (ধম্মপদ-দন্ডবর্গ-১৬)
অর্থাৎ : কশাঘাত ক্লিষ্ট ভদ্র অশ্ব যেমন ক্ষিপ্র ও বেগবান হয়, তেমনি শ্রদ্ধা, শীল, বীর্য, সমাধি ও ধর্ম বিনিশ্চয় প্রজ্ঞায় বিদ্যাচরণ সম্পন্ন ও স্মৃতিমান হও। তাহলে দুঃখরাশিকে অপনোদন করতে পারবে।
এবং সংযুক্তনিকায়ে নির্বাণার্থি ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে বুদ্ধ বলেছেন (মজ্ঝিমনিকায়-১০৪ সূত্রেও বুদ্ধের অনুরূপ বাণী রয়েছে)-
‘সেয্যথাপি ভিক্খবে! তেলং চ পটিচ্চ বট্টিং প পট্টিচ্চ তেলপ্ পদিপো ঝায়েয্য, তত্র পুরিসো ন কালেন কালং তেলং আসিঞচেয্য, ন বট্টিং চ উপসংহরেয্য। এবং হি সো ভিক্খবে! তেলপ্পদিপো পুরিমন চ উপাদানস্স পরিযাদানা অঞ্ঞস্সচ অনুপাহারা অনাহারো নিব্বায়েয্য। এবং এব খো ভিক্খবে! সঞযোজনীয়েসু ধর্মেসু আদীনবানুগস্সিনো বিহরতো তণ্হা নিরুজ্ঝতি, তণ্হানিরোধা উপাদান-নিরোধোপি। এবং এতস্স কেবলস্স দুক্খখন্ধস্স নিরোধো হোতি।’- (সংযুক্তনিকায়)
অর্থাৎ :
হে ভিক্ষুগণ! তৈল ও বর্তি সংযোগে প্রজ্বলিত প্রদীপে যদি কেউ আর তৈল ও বর্তি যোগ না করে তবে প্রদীপ যেমন উপাদানের অভাবে নির্বাপিত হয়, সেইরূপ যিনি সমস্ত সংযোজনের অস্থিরত্ব উপলব্ধি করে অনাহারে বিচরণ করেন, তাঁর তৃষ্ণা নিরুদ্ধ হয়, তৃষ্ণা-নিরোধে উপাদান নিরুদ্ধ হয় এবং দুঃখের নিদান পঞ্চস্কন্ধের নিরোধ হয়।

বিস্তারিত দেখুন

সম্পর্কিত খবর গুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close